ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সদ্য স্বাক্ষরিত মেগা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পর্তুগালের ব্যবসায়ী নেতারা তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ভারতীয় পণ্যে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাজার, বিশেষ করে পর্তুগিজ বাজার, আগ্রাসনের মুখে পড়তে পারে; অনেকের ভাষায় এটি “চীনের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি” হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
১৮ বছর ধরে আলোচনার পর সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি শুল্ক ধীরে ধীরে প্রত্যাহার হবে, এবং দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য বাজার গড়ে উঠবে। ইউরোপীয় কমিশন আশা করছে, এ চুক্তির মাধ্যমে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতের উদ্দেশে ইইউ–এর রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে।
পর্তুগালের উদ্যোক্তা সংগঠন অ্যাসোসিয়াসাও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্তুগেসা (এআইপি)–এর সভাপতি সতর্ক করে বলেছেন, টেক্সটাইল, পোশাক ও জুতা খাত এই চুক্তিতে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়তে পারে, কারণ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদকদের একটি এবং তাদের শ্রম ব্যয় পর্তুগালের তুলনায় অনেক কম। তিনি আরও ইঙ্গিত করেছেন, জেনেরিক ওষুধের বাজারেও ভারতীয় জেনেরিকের বাড়তি প্রবেশাধিকার পর্তুগিজ উৎপাদকদের লাভের মার্জিন কমিয়ে দিতে পারে।
পর্তুগিজ টেক্সটাইল ও পোশাক সমিতি (এটিপি)–এর সভাপতি রিকার্দো সিলভা এই চুক্তিকে ঘিরে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করে বলেছেন, ভারতের মতো শক্তিশালী ও দাম–নির্ভর টেক্সটাইল উৎপাদক বাজার খুলে দিলে পর্তুগিজ কোম্পানিগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব কমে যেতে পারে এবং স্বল্পমেয়াদে “বিপর্যয়”ও দেখা দিতে পারে। তাঁর মতে, বিশেষ করে নিটওয়্যার, সুতা ও ফেব্রিক্সে ভারতীয় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
ইইউ–ভারত চুক্তির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতীয় তৈরি পোশাক ও হোম টেক্সটাইলের ওপর আগের প্রায় ৯–১২ শতাংশ আমদানি শুল্ক ধীরে ধীরে শূন্যে নেমে আসবে। এতে ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ভারতীয় কটন ও ম্যান–মেড ফাইবার ভিত্তিক পণ্য আরও কম দামে পাওয়া সম্ভব হবে, যা ক্রেতাদের জন্য সুবিধা তৈরি করলেও ইউরোপ তথা পর্তুগালের ক্ষুদ্র ও মাঝারি টেক্সটাইল উৎপাদকদের জন্য তীব্র চাপ ডেকে আনতে পারে।
কোন কোন পর্তুগিজ শিল্প সবচেয়ে ঝুঁকিতে
১) টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় টেক্সটাইল উৎপাদক; কটন, ম্যান–মেড ফাইবার, গার্মেন্টস ও হোম টেক্সটাইল–সবখানেই তাদের বৃহৎ স্কেল ও কম শ্রম–ব্যয় আছে, যা শুল্কহীন প্রবেশাধিকার পেলে দাম–নির্ভর প্রতিযোগিতায় পর্তুগিজ কারখানাগুলোর জন্য বড় হুমকি।
ইইউ–ভারত চুক্তির ফলে ভারতীয় পোশাকের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ধাপে ধাপে শূন্য হওয়ায় ইউরোপীয় রিটেইলাররা সস্তা ভারতীয় পণ্যের দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে, এতে পর্তুগালের ‘বেসিক’ গার্মেন্ট ও নিটওয়্যার উৎপাদকরা অর্ডার হারাতে পারেন।
২) জুতা শিল্প
ভারতীয় ফুটওয়্যারের ওপর শুল্ক কমে গেলে মধ্য ও নিম্নমূল্যের সেগমেন্টে পর্তুগিজ জুতা–উৎপাদকদের জন্য সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হবে; বহু বছর ধরে তারা ইতিমধ্যেই চীনা কমদামি জুতার চাপ সামলাচ্ছে, এখন সেই জায়গায় ভারতও যোগ হবে।
পর্তুগাল ঐতিহ্যগতভাবে মান ও ডিজাইনে নিজেদের আলাদা করেছে, কিন্তু “ভলিউম ও দামের” বাজারে ভারতীয় পণ্যের স্রোত স্থানীয় ক্ষুদ্র–মাঝারি কারখানাগুলোর জন্য টিকে থাকা কঠিন করে তুলতে পারে বলে ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করছেন।
৩) জেনেরিক ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস
ভারতকে “বিশ্বের ফার্মেসি” বলা হয়; জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে তাদের বিশাল সক্ষমতা আছে। চুক্তির ফলে ভারতীয় জেনেরিক ওষুধ ইউরোপীয় বাজারে আরও কম ট্যারিফে ঢুকতে পারলে পর্তুগিজ জেনেরিক প্রস্তুতকারীরা মার্জিন–চাপের মুখে পড়তে পারেন।
৪) নিম্ন–প্রযুক্তি, শ্রমনির্ভর শিল্প
পূর্বের গবেষণা দেখিয়েছে, চীনা প্রতিযোগিতার কারণে নিম্ন–প্রযুক্তি ও শ্রমনির্ভর খাতে, বিশেষ করে টেক্সটাইল, পোশাক, ফুটওয়্যার ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্যে পর্তুগিজ রপ্তানি–শেয়ার কমেছে এবং এসব শিল্পে কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এখন ভারতীয় প্রতিযোগিতা একই ধরনের পণ্য–সেগমেন্টে (লো–ভ্যালু অ্যাডেড পোশাক, সাধারণ টেক্সটাইল, সস্তা জুতা, প্লাস্টিক–ভিত্তিক ভোগ্যপণ্য) জায়গা করে নিলে চীনের ধাক্কার পর আরেকটি নতুন আঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে।
আগে চীনের কারণে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল পর্তুগাল
পর্তুগিজ শ্রমবাজার নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, চীনা রপ্তানির উত্থান পর্তুগালের জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক শক ছিল, যদিও অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা পণ্যের সরাসরি আমদানির প্রভাবের চেয়ে তৃতীয় দেশে রপ্তানি–বাজারে প্রতিযোগিতাই বেশি ক্ষতি করেছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, পোশাক, জুতা ও স্বল্প–প্রযুক্তির ইলেকট্রিকাল পণ্য খাতে চীনা পণ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পর্তুগিজ রপ্তানি–শেয়ার কমে যায়।
এই গবেষণায় দেখা যায়, চীনা প্রতিযোগিতায় বেশি এক্সপোজড শিল্পের শ্রমিকদের চাকরি ও মোট আয় তুলনামূলকভাবে বেশি কমেছে; বিশেষভাবে নারী, বয়স্ক ও স্বল্প–শিক্ষিত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, নতুন বাণিজ্য–শক মোকাবিলায় শুধু শিল্পনীতি নয়, সামাজিক সুরক্ষা ও পুনঃপ্রশিক্ষণ নীতিও জরুরি।