গত এক মাস ধরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোতে দফায় দফায় হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিছু কিছু লক্ষ্যবস্তুতে বারবার আঘাত হানা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আকাশ থেকে নামানো যাচ্ছে না তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে। পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক সক্ষমতা ৯০ শতাংশ ধ্বংস হলেও অবশিষ্ট শক্তি দিয়েই রণক্ষেত্রে টিকে থাকার নতুন কৌশল নিয়েছে দেশটি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি থাকা ইরানি ঘাঁটি ও ট্রাক-লঞ্চারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তেহরান এখন দেশটির অনেক গভীর থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার হার এখন অনেক কমেছে। এখন দিনে মাত্র ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান। তবু এই অল্প সংখ্যা দিয়েই তারা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে বড় ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম হচ্ছে।
সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেল বলেন, ‘যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর মতো তারা এখন আর ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে না, আসলে সেটার প্রয়োজনও নেই। তাদের লক্ষ্য হলো শুধু দু-একটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভেদী করা, তাতেই তারা বড় সাফল্য পেয়ে যাচ্ছে।’
তেহরানের এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো, সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করা, তেল রফতানিকারক দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং টিকে থাকা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার পথ খুঁজছেন, তখন ইরানের এই অবশিষ্ট অস্ত্রভাণ্ডার বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এখন যুদ্ধ থেমে গেলে ইরান ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি থেকে অস্ত্র বের করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা সংস্কার করে পুনরায় নিজেদের শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
ইরানি প্রতিরোধের এক বড় উদাহরণ হলো ইয়াজদ শহরের কাছে অবস্থিত ইমাম হোসেন স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল হেডকোয়ার্টার। এটি মূলত ইরানের শক্তিশালী খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রধান কেন্দ্র। ১ হাজার ২০০ মাইলেরও বেশি পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র বিশাল যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, পাহাড়ের নিচে অবস্থিত এই ঘাঁটির প্রবেশপথগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং আকাশ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। তা সত্ত্বেও এখান থেকে পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, ‘তারা মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলা সহ্য করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এমন কিছু একটা তারা করছে যা তাদের এই অপারেশনগুলো চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে।’
মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, তারা পদ্ধতিগতভাবে ইরানের সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। মার্কিন অ্যাডমিরাল ব্রাড কুপার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ১০ হাজার এবং ইসরায়েল আরও কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রের দুই-তৃতীয়াংশই এখন ধ্বংস। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, ইরানের আনুমানিক ৪৭০টি মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের মধ্যে তারা ৩৩০টিই অকেজো করে দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, যা ইরানের জন্য পুনরায় অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলাকে কঠিন করে তুলবে।
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো কেলি গ্রিকো জানান, ইরান এখন আর সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মনোযোগ না দিয়ে বরং তেল শোধনাগার, হোটেল এবং বেসামরিক এলাকায় আঘাত হানছে। এতে তাদের ছোট ছোট হামলাগুলোও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। গত সপ্তাহান্তেও ইরান ইসরায়েলের ডিমোনা এবং আরাদ শহরে খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে।
মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের গবেষক তাল ইনবার বলেন, ‘ইরান একটি বিশাল দেশ এবং কারও পক্ষেই আকাশের চোখ দিয়ে সব জায়গায় নজর রাখা সম্ভব নয়।’ ইরানি বাহিনী এখন অপেক্ষায় থাকে কখন মার্কিন বা ইসরায়েলি বিমানগুলো এলাকা ছেড়ে চলে যাবে। আকাশ পরিষ্কার দেখলেই তারা সুড়ঙ্গ থেকে লঞ্চার বের করে দ্রুত হামলা চালিয়ে আবারও আত্মগোপন করছে।