মোঃ মাইন উদ্দিন :
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার এক সাধারণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাইজুল ইসলাম। একটি জিলাপি বিক্রির সাধারণ ভিডিও থেকেই হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর থেকেই মিডিয়া, ইউটিউবার, ফেসবুক কনটেন্ট নির্মাতাদের যেন এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে উঠে তাইজুল। প্রতিদিন তার বাড়িতে ভিড়, চলছে সাক্ষাৎকার, দেওয়া হচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। সবমিলিয়ে যেন দেশের সব আলোচনার কেন্দ্র এখন একজন সাধারণ মানুষ তাইজুল।
কিন্তু এই হঠাৎ পাওয়া জনপ্রিয়তা কি তাকে স্বস্তি দিচ্ছে? মোটে না, বরং উল্টো চিত্রই সামনে আসছে। তাইজুল নিজেই জানিয়েছেন, দিনভর মিডিয়ার চাপ সামলে তিনি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া বা বিশ্রামও নিতে পারছেন না। কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়ছে।
অথচ এই মানুষটির পেছনের গল্প একেবারেই ভিন্ন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া তাইজুল রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কায়িক পরিশ্রম করে সংসার চালান। তার বাবা-মা শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ থাকায় পুরো পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে একটু স্বস্তি পেতেই তিনি ভিডিও তৈরি শুরু করেন। গত দেড় বছরে প্রায় ১৪০টি ভিডিও বানিয়েছেন, যেখানে নিজের প্রচার নয়, বরং তুলে ধরেছেন এলাকার অবহেলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা।
নাগেশ্বরীর দুর্গম নারায়ণপুর ইউনিয়নের এই তরুণের ‘তাজু ২.০’ পেজ অল্প সময়েই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু জনপ্রিয়তার এই ঢেউয়ের সঙ্গে এসেছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ, অপ্রস্তুত প্রশ্ন, এমনকি মানসিক চাপ। স্থানীয়দের মতে, সহজ-সরল তাইজুলকে জোর করে একটি ‘ভাইরাল চরিত্রে’ রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা তার স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তার আশ্বাস এবং জমি বা আর্থিক সহযোগিতার কথা নিশ্চয়ই ইতিবাচক। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এসব সহায়তা কতটা স্থায়ী হবে? নাকি এই আগ্রহও সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে যাবে, আর তাইজুলও ফিরে যাবেন আগের সংগ্রামী জীবনে?
তাইজুল নিজে বারবার বলেছেন, তিনি নিজের জন্য নয়, তার এলাকার অবহেলিত মানুষের জন্য সহযোগিতা চান। কিন্তু আমরা কি সেই বার্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছি? নাকি তাকে ঘিরে কেবল কৌতূহল, ভিউ আর কনটেন্ট তৈরির প্রতিযোগিতাতে মেতে উঠেছি?
সময়ের দাবি একটাই, তাইজুলকে তার মতো থাকতে দেওয়া। তার সরলতা, মানবিকতা এবং স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা। অন্যথায়, এই ক্ষণস্থায়ী আলোয় আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি একজন নির্মল, নির্ভেজাল মানুষকে, যিনি ভাইরাল হওয়ার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই পরিচিত হতে চেয়েছিলেন।
ভাইরাল হওয়ার চেয়েও বড় পরিচয় হচ্ছে একজন মানুষ হওয়া। তাইজুল সেই পরিচয়টি-ই ধরে রাখতে চান। এখন দায়িত্ব আমাদের, আমরা কি তাকে একজন মানুষ হিসেবে সম্মান করব, নাকি কেবল ক্ষণিকের কনটেন্ট বানিয়ে ভুলে যাব?