রহমত নাজাতের আর মাগফিরাতের পবিত্র এই মাস শেষ পর্যায়ে। মুমিন মুসলমানের হৃদয়ে একদিকে যেমন বিদায়ের করুণ সুর, অন্যদিকে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শেষ মুহূর্তের ব্যাকুলতা। রমজান কেবল না খেয়ে থাকার বহিঃপ্রকাশ নয়,বরং এটি একটি সামগ্রিক চারিত্রিক পরিবর্তনের প্রশিক্ষণ। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণাবলি বিকশিত হয়।
রমজানের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দেওয়া যে, আল্লাহ তাকে সর্বদা দেখছেন।
অভুক্ত থাকার ফলে বিত্তবানরা অভুক্ত মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারেন। এর ফলে সমাজ থেকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করার মানসিকতা তৈরি হয় এবং দান-সদকার মাধ্যমে সামাজিক সেতুবন্ধন দৃঢ় হয়।
রমজানের শিক্ষা হলো শুধু পেট নয়, বরং চোখ, কান এবং বিশেষ করে জিহ্বাকে সব ধরনের গিবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখা।
এটি মানুষের চারিত্রিক বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে।
বর্তমান ভোগবাদী পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন মানুষ বস্তুগত সুখ আর বিলাসিতার চরম শিখরে বিচরণ করছে, ঠিক অন্য প্রান্তে লক্ষ কোটি মুসলিম নর-নারী,শিশু ও বৃদ্ধ পার করছে মানবেতর জীবন।
মুসলিম বিশ্ব যখন সিয়াম সাধনা শেষে উৎসবের আমেজে মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিশ্ব রাজনীতির অন্য এক প্রান্তে চলছে শোক আর হাহাকারের আর্তনাদ। মানবতার ফেরিওয়ালা পশ্চিমা দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে সুস্থ মানুষদেরকে পঙ্গু করে দিচ্ছে!
মিসাইলের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে যুগ যুগ ধরে সাজানো শহরগুলো। যার ফলে সর্বোচ্চ হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে সেহরি কিংবা ইফতার অনিশ্চয়তা দিবা-রাত্রে কাটাচ্ছে।খাদ্য সংকটের সাথে বিশুদ্ধ পানির সংকটে আর মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
যুদ্ধের লেলিহান শিখায় চূর্ণ-বিচূর্ণ মানবতা
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আজ যেন এক একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। যে অর্থ দিয়ে পৃথিবীর ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব ছিল, সেই অর্থ আজ ব্যয় হচ্ছে মারণাস্ত্রের পেছনে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে যখন কোনো মা তার সন্তানের মুখে এক টুকরো শুকনো রুটি বা এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি তুলে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন আমাদের ড্রয়িং রুমের বিলাসী ইফতার আয়োজন এক নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। বাস্তবতার এই সময়টুকু দাঁড়িয়ে এবারের ঈদ উদযাপন কতটুকু যুক্তিযুক্ত—এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি বিবেকবান মুসলমানদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে!
এই চরম সংকটে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে— আমরা সাধারণ নাগরিক হয়ে কী করতে পারি?
মূলত, এটি আমাদের সবার জন্যই এক কঠিন পরীক্ষা।
পবিত্র কুরআন কি বলছে: নিশ্চয়ই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়,ক্ষুধা,মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসলের বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।
(সূরা বাকারা: ১৫৫)
যাদের আজ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের ধৈর্য পরীক্ষা হচ্ছে। আর আমাদের পরীক্ষা হচ্ছে—সব পেয়েও আমরা আমাদের অভাবী ভাই-বোনদের প্রতি কতটুকু সহমর্মিতা প্রকাশ করছি।
প্রকৃত মুসলিম যারা তাদের ব্যাপারে প্রিয় নবী করীম সাঃ বলেন—–
সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।” বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পুরো মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের মতো। দেহের এক অংশে আঘাত লাগলে যেমন অন্য অংশ ব্যথা অনুভব করে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিমদের কষ্টও আমাদের ঈদ উদযাপনে ছাপ ফেলা স্বাভাবিক। কোরআনের অন্যত্র বলেছেন—তারা নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দেয়, নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও।
আল-হাশর: ৯ আয়াতে
সচেতন মুসলমান হিসেবে বর্তমান বিশ্বের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আমাদের ত্যাগ ও সহমর্মিতার দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় বিভিন্ন চিত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ইফতার মাহফিল আয়োজন নিয়েই বেশি তৎপরতা ব্যস্থ মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো ব্যস্ত যাকাত ও সদকা সংগ্রহে; আবার কিছু সংগঠন ঈদকে সামনে রেখে মেলা ও বাণিজ্যিক আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। বিভিন্ন মসজিদ গুলোতে ঘন্টা পর ঘন্টা চাদা কালেকশনের জন্য ব্যয় করছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের সংকটে বাংলাদেশ সহ এশিয়ার দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকটে ধাবিত হচ্ছে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি শ্রমজীবীদের সংকট মানে দেশের সংকট। সেই বিষয় গুলোকে নিয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার মত কোন আলেমকে মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে কথা বলার মত বাস্তব কোন তৎপরতা নেই। অন্যদিকে ধনীদের একাংশ ডুবে আছে বিলাসিতায়। প্রশ্ন জাগে—ইসলাম কি আমাদের এটাই শিক্ষা দেয়, নাকি এর চেয়ে বড় মানবিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়?
আমাদের কিছু করণীয় আল্লাহকে সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে যেমন—
মিতব্যয়িতা: ঈদের কেনাকাটায় অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ আর্তমানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করা আজ সময়ের দাবি।
সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ব্যয়বহুল ইফতার মাহফিল এবং অপ্রয়োজনে ব্যয় কমে নেওয়া।
যাকাত ও ফিতরার অর্থ যদি সুপরিকল্পিতভাবে সংকটাপন্ন এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তবেই তা প্রকৃত ইবাদত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে সার্থকতা পাবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটসহ বিভিন্ন কারণে দেশে অসংখ্য পরিবার চরম অর্থনৈতিক চাপে হিমশিম খাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সামাজিক সংগঠনগুলোকে কেবল প্রথাগত সাহায্য নয়, বরং বাস্তবমুখী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সহমর্মিতার চর্চা: সংযম কেবল দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, বরং অন্যের অভাবকে নিজের বলে অনুভব করা। আমরা যদি আমাদের ঈদের বাজেটের অন্তত ১০% থেকে ২০% অংশ আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন বিশ্বস্ত দাতব্য সংস্থায় দান করি, তবেই রমজানের ‘সহমর্মিতা’র শিক্ষা পূর্ণতা পাবে।
বিলাসিতা বর্জন ও মিতব্যয়িতা: উৎসবের নামে আমরা যখন হাজার হাজার টাকা অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বা ব্র্যান্ডের পোশাকে ব্যয় করি, তখন মনে রাখা প্রয়োজন—সেই অর্থের একটি ক্ষুদ্র অংশও হয়তো কোনো এক প্রান্তে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে একবেলা অন্ন তুলে দিতে পারতাম। এবারের ঈদে আমাদের ত্যাগ হোক ‘অতিরিক্ত বিলাসিতা ত্যাগ করা’।
মানসিক সংহতি ও দোয়া: নাগরিক হিসেবে আমাদের অন্যতম অস্ত্র হলো জনমত তৈরি করা। লেখনি বা আলোচনার মাধ্যমে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ইবাদতের প্রতিটি মুহূর্তে তাদের জন্য প্রার্থনা করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।
রমজান আমাদের যে সংযম শিখিয়েছে, তার প্রতিফলন হওয়া উচিত আমাদের যাপনে। মধ্যপ্রাচ্যের সেই পঙ্গু শিশু কিংবা ঘরহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস উপেক্ষা করে বিলাসী ঈদ উদযাপন কখনোই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। এবারের ঈদের আনন্দ কেবল নতুন পোশাকে নয়, বরং হোক মানবতার পাশে দাঁড়ানোর আত্মতৃপ্তিতে। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের ঈদ।
“পৃথিবীর এক প্রান্তের দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে অন্য প্রান্তে ঈদের চাঁদ কখনোই পূর্ণিমার আলো ছড়াতে পারে না; যদি না আমরা সেই আর্তনাদে সাড়া দিই।”
মিসবাহ উদ্দিন আহমদ