রমাদানের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও ফজিলতপূর্ণ সময় হলো শেষ দশক। এ দশকের মর্যাদা ও গুরুত্ব রমাদানের প্রথম ও দ্বিতীয় দশকের তুলনায় অনেক বেশি। এই দশকে মহান আল্লাহ মানবজাতির হিদায়াতের আলোকবর্তিকা পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন এবং এই দশকের মধ্যেই রয়েছে মহিমান্বিত লাইলাতুল কদর। যে রজনি হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
রসুল (সা.) এই দশকে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায়, এমনকি রমাদানের প্রথম বিশ দিনের তুলনায়ও অধিক ইবাদতে মগ্ন হতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, নবীজি (সা.) রমাদানের শেষ দশকে ইবাদত-বন্দেগিতে এমনভাবে পরিশ্রম করতেন, যা তিনি অন্য কোনো সময় করতেন না (সহিহ মুসলিম)।
রমাদানের শেষ দশক ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময়কিন্তু দুঃখজনক হলো, ফজিলতপূর্ণ এই দশকে যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার কথা ছিল, সে সময় আমরা মেতে উঠি ঈদের কেনাকাটা, বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি এবং অহেতুক নানা আমেজে। বিপণিবিতানগুলোর জাঁকজমকের ভিতরে হারিয়ে যায় আমাদের মর্যাদাপূর্ণ কদরের রাত, ইতিকাফ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল। অথচ হতে পারে এটাই আমাদের জীবনের শেষ রমাদান।
রসুল (সা.)-এর ভাষ্যমতে যে রমাদান পেল অথচ নিচের গুনাহ ক্ষমা করাতে পারল না সে দুর্ভাগা (সুনানে তিরমিজি)। তাই আসুন, আলস্য, অবহেলা ও অহেতুক আমেজ-আয়োজনে সময় নষ্ট না করে এই গুরুত্বপূর্ণ দশকের প্রতিটি প্রহরকে আমরা ইবাদতের সুবাসে সুরভিত করি। আমাদের সর্বশক্তি ব্যয় করি মহান আল্লাহর আনুগত্যে। নবীজি (সা.) এই মর্যাদাপূর্ণ দশকে প্রধানত পাঁচটি কাজ অত্যন্ত গুরুত্ব ও যতেœর সঙ্গে পালন করতেন। আমাদেরও উচিত এই আমলগুলোর ব্যাপারে যত্নবান হওয়া।
এক. রাত্রি জাগরণ করা : রমাদানের শেষ দশকের প্রতিটি রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমা ও জান্নাত লাভের আশায় এই দশকে বেশি বেশি রাত্রি জাগরণ করা উচিত। নবীজি (সা.) শেষ দশকে সবচেয়ে বেশি রাত্রি জাগরণ করতেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
দুই. পরিবারকে ঘুম থেকে জাগানো : নবীজি (সা.) নফল ইবাদতের জন্য সাধারণত পরিবারকে জাগাতেন না। কিন্তু রমাদানের শেষ দশক এত গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবার এর থেকে বঞ্চিত হোক এটা তিনি চাইতেন না। তাই রমাদানের শেষ দশকে তিনি পরিবারকে এবং আশপাশের মানুষদের জাগিয়ে দিতেন। এটি আমাদের পারিবারিক জীবনের জন্যও এক বড় শিক্ষা। আমরা যেন নিজেরা পুণ্যবান হওয়ার পাশাপাশি সন্তানাদি ও পরিবারকেও জান্নাতের পথে পরিচালিত করি।
তিন. কোমর বেঁধে ইবাদতে নেমে যাওয়া : কোমর বেঁধে নামা বলতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির সঙ্গে ও পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে ইবাদতে মগ্ন হয়ে যাওয়া। তবে কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেছেন, এর মানে হলো, এই সময়ে স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ইবাদতে মগ্ন হওয়া।
চার. লাইলাতুল কদর তালাশ করা : শেষ দশকের প্রতিটি রাতই লাইলাতুল কদর হতে পারে। বিশেষ করে বিজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। এ কারণেই নবী করিম (সা.) বিজোড় রাতগুলোতে কদর তালাশ করতে নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা রমাদানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে কদর তালাশ করো (সহিহ বুখারি)।’ অর্থাৎ এই রাতগুলোতে নবীজি (সা.) বিশেষভাবে ইবাদত, জিকির, তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে উৎসাহিত করেছেন। যে ব্যক্তি এই মহিমান্বিত রাতটি পেয়ে যাবে, সে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠতম রাত পেয়ে যাবে। এবং এক রাতের ইবাদতের ফলে হাজার মাসের ইবাদতের সমতুল্য সওয়াব তার আমলনামায় যুক্ত হবে।
পাঁচ. এতেকাফ : এতেকাফ নবীজি (সা.)-এর আজীবনের আমল। দুনিয়াবি সব ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে পূর্ণরূপে আল্লাহর নিকট সঁপে দেওয়া হলো এতেকাফের মূল দর্শন। বর্তমানে এই যান্ত্রিক ও চরম অস্থিরতার সময়ে নিজেকে খুঁজে পেতে এতেকাফের আমল এক অনন্য মাধ্যম। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) রমাদানের শেষ দশক এতেকাফ করতেন। মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর সহধর্মিণীরাও এই দিনগুলোতে এতেকাফ করতেন (সহিহ বুখারি)।’
সুতরাং আমাদের উচিত এই দশককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। এবং নবীজি (সা.)-এর এই আমলগুলো নিজের জীবনে প্রতিফলিত করা। তবেই আমাদের সিয়াম ও কিয়াম পূর্ণতা পাবে। মহান আল্লাহ আমাদের এই মহিমান্বিত দশকে তাঁর বিশেষ রহমত ও লাইলাতুল কদরের বরকত নসিব করুন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।