মোঃ মাইন উদ্দিন :
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু হ/ত্যা ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রায়ই কোনো না কোনো গণমাধ্যমে উঠে আসছে শিশু হত্যার খবর। এসব ঘটনা শুধু একটি পরিবারকেই শোকের সাগরে ডুবিয়ে দেয় না, পুরো সমাজকেই নাড়া দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বাড়ছে এই ভয়াবহ অপ/রাধ?
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর প্রতিবেশীর নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে ছয় বছর বয়সী আবদুর রহমান নামের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
১৫ মার্চ রোববার সকালে উপজেলার মরজাল ইউনিয়নের চরমরজাল গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। নিহত আবদুর রহমান ওই গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী শক্কুর আলীর ছেলে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষের মনে নতুন করে আত/ঙ্ক জন্ম নিয়েছে।
কিন্তু এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের দ্বারিয়াকান্দি কাঁটালতলা এলাকায় চার মাস বয়সী এক শিশুকে হ/ত্যার ঘটনাও দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। এমন ঘটনা যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বারবার ঘটছে একই ধরনের নির্মমতা।
শিশুরা স্বভাবতই নিষ্পাপ, নিরীহ এবং অসহায়। তাদের সঙ্গে এমন নির্মম আচরণ একটি সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক। তাই স্বাভাবিকভাবেই সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের অপরাধের পেছনের কারণ কী?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিশু হত্যা ও নির্যা/তন বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। পরিবার ও সমাজে মানবিক শিক্ষার ঘাটতি দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। মানুষ ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দুর্বল ও অসহায় শিশুদের ওপর।
দ্বিতীয়ত, মাদকাসক্তি একটি বড় কারণ হিসেবে সামনে আসে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন অপরাধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে মাদক জড়িত।
তৃতীয়ত, যৌ/ন বি/কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয়ও শিশু নির্যা/তন ও হত্যার অন্যতম কারণ। শিশু ধ/র্ষণের ঘটনা প্রায়ই শিরোনাম হয়, আর অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাট করতে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এটি সমাজের জন্য এক ভয়ংকর সংকেত।
এছাড়া আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধীদের অনেক সময় সাহস জোগায়। যখন অপরাধীরা দেখে যে অপরাধ করেও দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না, তখন অপরাধ প্রবণতা কমার বদলে বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র, সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানের প্রতি আরও বেশি নজরদারি ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
কারণ মনে রাখতে হবে, শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। আর যদি একটি সমাজ তার শিশুদেরই নিরাপদ রাখতে না পারে, তবে সেই সমাজের সভ্যতার দাবি সত্যিই প্রশ্নের মুখে পড়ে