যশোরের মণিরামপুর আসনে (যশোর-৫) প্রতিদ্বন্দ্বী মূল তিন প্রার্থীর মধ্যে যিনি ‘সংখ্যালঘু ভোট টানতে পারবেন, জয়ের মালা তার গলাতেই শোভা পাবে’- এ রকম কথা এখন সেখানকার ভোটের মাঠে। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৪২৭। যার মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৩৬।
যশোরের মণিরামপুর আসনে (যশোর-৫) প্রতিদ্বন্দ্বী মূল তিন প্রার্থীর মধ্যে যিনি ‘সংখ্যালঘু ভোট টানতে পারবেন, জয়ের মালা তার গলাতেই শোভা পাবে’- এ রকম কথা এখন সেখানকার ভোটের মাঠে।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৪২৭। যার মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৩৬।
সংখ্যালঘুদের এই ভোট এক সময় আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হলেও এবার টানতে হবে সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই। আর এই ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে প্রার্থীরা বারবার তাদের দ্বারে ছুটছেন। ভবদহের সমস্যা সমাধান, সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান ইত্যাদিই হচ্ছে তাদের প্রতিশ্রুতি।
এইভোটের পাশাপাশি জয়-পরাজয়ে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারও। ভোটের মাঠে এসব ভোটারের উপস্থিতি পাল্টে দিতে পারে সব হিসাবনিকাশ।
এবারের নির্বাচনে মণিরামপুর থেকে ছয়জন প্রার্থী লড়াই করছেন। তারা হলেন- ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে রশীদ আহমাদ, ‘হাতপাখা’ প্রতীকে জয়নাল আবেদীন টিপু, ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে এমএ হালিম, ‘কলস’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ ইকবাল হোসেন ও ‘ফুটবল’ প্রতীকে কামরুজ্জামান।
মণিরামপুর বাজারে জনবহুল একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন স্থানীয় লোকের আলাপে উঠে আসে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষর ভাবনা। একজন বলেন, দিন যতো যাচ্ছে ‘কলস মার্কার’ অবস্থা ভালো হচ্ছে। আরেকজন বললেন, কলস এবং ধানের শীষের টানাটানিতে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বেরিয়ে যেতে পারে।
আরেকজন বললেন, সাধারণ আওয়ামী কর্মীরা যদি ভোট দিতে যায়, তাহলে এই হিসাব থাকবে না। তার মতে, আওয়ামী ভোটারদের যারা কাছে টানতে পারবে, তারাই বিজয়ী হবে। কলস মার্কার পক্ষে যিনি বলছিলেন, তিনি জিজ্ঞাসা করেন- আর হিন্দু ভোট?
ত্বড়িত জবাব আসে- হিন্দু ভোট তো আওয়ামী লীগই নিয়ন্ত্রণ করত! অবশ্য এটাও ঠিক, তারা যেদিকে হেলবে- সেদিকটাই উপরে উঠবে..।
স্থানীয়দের মতে, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রশীদ আহমাদ নতুন মুখ। তার বাবা মুফতি ওয়াক্কাসকে সবাই চিনতেন। কিন্তু রশীদ আহমাদকে মানুষ খুব একটা চেনে না। ভোটের লড়াই হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ও জামায়াতের গাজী এনামুল হকের মধ্যে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির ভোট কাটতে পারে। জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
সংশ্লিষ্ট ভোটারদের সঙ্গে আলাপকালে বোঝা গেছে, এবার এই আসনে লড়াইটি হবে ত্রিমুখী। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় মণিরামপুরে বিএনপির ভোটারদের মাঝে একটি বড় বিভক্তি রয়েছে। এই বিভক্তি দাঁড়িপাল্লার নির্বাচনি লড়াই সহজ করে দিয়েছে।
কলস প্রতীকে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় শহীদ ইকবালকে থানা বিএনপির সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও বিএনপির ভোটের বিভক্তি কমানো যায়নি। বরং থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পদধারী অনেক নেতা শহীদ ইকবালের হয়ে কলসের ভোট করছেন।
এছাড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের কলসের পক্ষে সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের মুখেও শোনা যাচ্ছে কলসের নাম। ভোটের মাঠে উঠতে পারলে তাদের ভোটের বড় অংশটি শহীদ ইকবালের পক্ষে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন মুখ হলেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের একাংশের যুগ্ম সম্পাদক রশীদ আহমাদ। ব্যক্তি নয়, দলকে ভালোবাসেন এমন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা কাজ করছেন রশীদ আহমাদের পক্ষে। এছাড়া সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারকে তার পক্ষে টানতে জোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
জামায়াতের নারী কর্মীরা দীর্ঘদিন পাড়া-মহল্লায় ঘুরে নারী ভোটারদের বুঝিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান তৈরি করেছেন। নতুন ভোটারের বড় একটি অংশকে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অনেক ভোটার মনে করছেন, এবার দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে ভোটের লড়াই হবে কলস ও ধানের শীষের।
গ্রামপর্যায়ে বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগের ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে অবস্থান নেওয়া তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ভোটের মাঠে যাওয়ার ইচ্ছা তাদের নেই। তারপরও যদি যেতে হয় তাহলে সার্বিক বিবেচনায় কলসই তাদের পছন্দ।
এদিকে মণিরামপুরের হরিদাসকাটি, কুলটিয়া, দুর্বাডাঙ্গা ও মনোহরপুর ইউনিয়নের বড় একটি অংশ হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এছাড়া পৌর এলাকায় হিন্দু ভোটারের বড় একটি অংশ রয়েছে।
তাদের কয়েকজন জানিয়েছে, এ অঞ্চলের বেশিরভাগ রয়েছে কলস প্রতীকের পক্ষে। এছাড়া কিছু ভোট পড়বে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষে।
মণিরামপুরের বিএনপিতে গ্রুপিং-দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। একটি অংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন দলের সদ্য বহিষ্কৃত থানা সভাপতি শহীদ ইকবাল হোসেন। অপরটির নেতৃত্বে ছিলেন সদ্য প্রয়াত মোহাম্মদ মুসা। এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে কামরুজ্জামান ও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু গ্রুপের হাল ধরেন। দলে বিভক্তি চরমে থাকলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শহীদ ইকবাল প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়ায় গ্রুপ ভেঙে অনেকে তার সঙ্গে যোগ দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ শুরু করেন। এরপর মণিরামপুরে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় দলের শরিক জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের একাংশের যুগ্ম সম্পাদক রশীদ আহমাদকে। তখনই বাধে বিপত্তি। প্রথমদিকে কিছুটা আপত্তি জানালেও দলের সিদ্ধান্ত মেনে বিএনপির একটি অংশ ধানের শীষের প্রার্থীকে নিয়ে প্রচারণায় নামেন।
আর ইকবাল হোসেনের অংশ তার সঙ্গে থেকে যায়। তারা কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় আন্দোলনে নেমে মনোনয়ন ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়। এরপর দলের নিজের অনুসারীদের নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন ইকবাল হোসেন। দলের অন্য অংশের কয়েকজন ইকবাল হোসেনের পক্ষে অবস্থান নেন।
বিএনপির এই অংশের দাবি, মণিরামপুর আসনে বারবার শরিক দলকে মনোনয়ন দেওয়ায় এ অঞ্চলে বিএনপির নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী করে তারা কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চান।
কলস প্রতীকের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট নিস্তার ফারুক বলেন, জয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী। তারা মাঠে আসতে পারলে হিন্দু ভোটের ৯৫ শতাংশ ভোট আমরা পাবেন।
তবে ভিন্নকথা বলছেন ধানের শীষের পক্ষের থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিন্টু।
তিনি বলেন, দলের একটা বড় অংশ নিয়ে শহীদ ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন; কিন্তু ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, যেই অংশ থেকে অনেকে বেরিয়ে ধানের শীষে ভিড়ছেন। দলের যেসব নেতাকর্মী শহীদ ইকবালের সঙ্গে আছেন, তাদের ছাড়া বিএনপির সাধারণ ভোটাররা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দেবেন না। আমাদের সঙ্গে হিন্দু ভোটারদের কথা হয়েছে। তাদের অনেককে এখন কলসের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গোপনে তারা ধানের শীষকেই ভোট দেবেন।
জানতে চাইলে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী গাজী এনামুল হক যুগান্তরকে বলেন, মণিরামপুরে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জোয়ার এসেছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট তার পক্ষেই পড়বে- দাবি করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি, হুমকি, গোয়াল থেকে গরু ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা তাদের মনে আছে।
তিনি বলেন, মুখে তারা ধানের শীষ বা কলস বললেও অন্তরে রয়েছে দাঁড়িপাল্লা।