আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংবিধান অনুযায়ী এটি গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়মিত প্রক্রিয়া হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ছে সহিংসতা, হামলা ও আতঙ্কের পরিবেশ।
বিশেষ করে ঝিনাইদহে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা সেক্রেটারিকে কুপিয়ে হত্যা, ঢাকা -৮ আসনের সংসদ প্রার্থী নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর উপর হামলা, এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী কর্মীদের ওপর হামলা ও প্রচারণায় বাধার ঘটনা নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।
নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে যেখানে থাকার কথা ছিল মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সেখানে এখন শোনা যাচ্ছে হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির শব্দ। বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের ক্যাম্পে হামলা, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, মিছিল-সমাবেশে বাধা এবং নেতাকর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। এতে শুধু দলীয় নেতাকর্মী নয়, সাধারণ ভোটাররাও পড়েছেন ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে।
যখন প্রার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না এবং প্রশাসন নীরব থাকে, তখন তাকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলা যায় না।”
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অসহনশীলতা এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতির জন্য বিশেষজ্ঞদের মতে অনেকগুলো কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন, যেমন— জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল, দেড় বছরেও সেগুলো পুরোপুরিভাবে উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের এখনও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্রপাতি উদ্ধার না হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না।
প্রশাসনের ভূমিকা: নির্বাচনী প্রচারণায় পক্ষপাতিত্ব ও সহিংসতার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রার্থীদের। ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় জোটের ঢাকা ৮ আসন প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, কুমিল্লা ১ আসনের প্রার্থী আসনাত আব্দুল্লাহ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ১২ দলীয় জোটের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন এবং সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনিরসহ অনেক নেতাকর্মী প্রশাসনের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নির্বাচনী সহিংসতা ও অপ্রীতিকর ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ‘নিরব দর্শকের’ ভূমিকা পালন করছে। এই পক্ষপাতী আচরণের বিরুদ্ধে তারা কড়া হুঁশিয়ারি ও সতর্কতা বার্তা দিচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনবিধি লংঘন করে ঋণ খেলাপদের মনোনয়ন বৈধতা দেওয়ায় প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মোট ৪৫ জন ঋণখেলাপি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ঋণের মোট পরিমাণ: টিআইবি-র তথ্যমতে, মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
ব্যাংক ঋণের পরিমাণ: মোট ঋণের মধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এই ঋণ খেলাপি প্রার্থী সবাই একটি নির্দিষ্ট দলের এবং কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন কমিশনার পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণের জন্য এদেরকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এটা নির্বাচনকে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছে:
বিএনপি বনাম জামায়াত: সম্প্রতি কুমিল্লা (চৌদ্দগ্রাম), ভোলা (বোরহানউদ্দিন) এবং যশোরে নির্বাচনী জনসভা বা প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৫-২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
দলীয় কোন্দল (বিদ্রোহী প্রার্থী): অনেক আসনে বিএনপির একক প্রার্থী না থাকায় বা বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী থাকায় নিজেদের মধ্যে ‘টার্ফ ওয়ার’ বা আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি স্থানে বিএনপির কনিষ্ঠ কর্মীরা জ্যেষ্ঠ নেতাদের থেকে হুমকির অভিযোগ করেছেন।
হামলা ও প্রাণহানি: মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।
সারা দেশে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাকে ঘিরে পরস্পর অভিযোগ থাকলেও, এবার আমরা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুতি আয়োজন করেছেন সে বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাক।
মূলত আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে লড়ছেন ৫১টি দলের ১,৯৭৩ জন প্রার্থী। মোট ভোটকেন্দ্র: ৪২,৭৬১টি।
মোট ভোটকক্ষ (বুথ): ২,৪৪,৬৪৯টি।
পুরুষ ভোটকক্ষ: ১,১৫,১৩৭টি।
নারী ভোটকক্ষ: ১,২৯,৬০২টি।
অস্থায়ী কেন্দ্র: প্রাথমিকভাবে ১৪টি অস্থায়ী কেন্দ্রের কথা জানানো হয়েছে।
প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের (যার মধ্যে ৬ কোটি ২৮ লাখই নারী ভোটার)
গড় ভোটার: প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ৩,০০০ জন।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র: নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী ৮,৭৮০টি কেন্দ্রকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যদিও নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ৯০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ সেনা সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনার পক্ষে থেকে বলা হয়েছে।
তবে বিভিন্ন বাহিনীর নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৫০ জন সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সহিংসতা রোধে প্রযুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে:
বডি-ওর্ন ক্যামেরা: ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের জন্য ২৫,০০০-এর বেশি বডি ক্যামেরা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ড্রোন নজরদারি: প্রথমবারের মতো নির্বাচনী এলাকায় নজরদারির জন্য ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে।
সিসিটিভি: গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে।
নারী কর্মীদের সুরক্ষা: নারী প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা ও সহিংসতার অভিযোগ আমলে নিয়ে ইসি পৃথক অভিযোগ ডেস্ক ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।
যদিও সেনাবাহিনী সাধারণত সরাসরি প্রতিটি ভোট কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করে না; তারা ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ (Striking Force) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু জনগণ আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর সদস্য সরাসরি মোতায়ন করা।
যদিও জাতি নির্বাচনে সরকারের গৃহীত নিরাপত্তামূলক প্রস্তুতি নীতিগতভাবে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা দেওয়া সত্ত্বেও জনগণ প্রত্যাশিত মাত্রায় আইনশৃঙ্খলার কার্যকর প্রয়োগ দেখতে পাচ্ছেনা, বরং বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়
বা নীরব দর্শকের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে, কোথাও সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা হচ্ছে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে।
এর পাশাপাশি সেনা প্রধান, অধিকাংশ উপদেষ্টাদের ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছামতো আইন প্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তি বা দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই বাস্তবতা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর দেশের জনগণ যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছে, তা নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে যেন আবার ভূলুণ্ঠিত না হয়—এটাই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
প্রশাসনিক জবাবদিহি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং জনগণের অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই এই নির্বাচনের একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড; পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের অস্তিত্ব রক্ষায় হাঁ ভোটকে নির্বাচিত করতে না পারলে জন-আকাঙ্ক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
পরিশেষে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা নাগরিক হিসেবে যদি ১৭ বছরের কাঙ্ক্ষিত ভোটাধিকার নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারি, তবেই তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেবে।
মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র