মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাপী ৮টি যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠারও দাবি করেছিলেন। আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিনন দেশে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের শুরু করা ‘অনন্তকালের যুদ্ধ’ সমাপ্ত করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাননি।
গত ২৮ ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে ট্রাম্প বড় ধরনের যুদ্ধে নেমে পড়েন। এর আগের দিন বিকেলে এয়ার ফোর্স ওয়ানে তিনি এই যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে ‘শান্তির দূত’ ট্রাম্প হয়ে গেলেন যুদ্ধবাজ নেতা। গতকাল শনিবার গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে এসব কথা বলা হয়।
ট্রাম্প তার ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলন বহির্শক্তি বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল এবং তিন নিজেই ২০২৫ সালের বেশিরভাগ সময় নোবেল শান্তি পুরষ্কার পাওয়ার জন্য তদবির করেছিলেন। তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ থেকে প্রধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ’ পরিচালনাকারী হয়ে ওঠেন।
ট্রাম্পের মনোভাবের রূপান্তরের নেপথ্যে
অপারেশন এপিক ফিউরির আগে ট্রাম্পের এই আপাত রূপান্তরের পিছনে বৈচিত্র্যময় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলোর একটি হচ্ছে নিজেকে ‘শো-ম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা। একগুঁয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি ধৈর্যহীন। তাছাড়া তার হাতে থাকা একটি সামরিক শক্তির প্রদর্শনেচ্ছুক মনোভাবও একটা কারণ।
বাস্তবে ট্রাম্প কখনও শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী ছিলেন না। যুদ্ধের প্রতি তার বিরোধিতা কেবলই লোক দেখানো। বিশেষ করে শত্রুদের শাস্তি দেওয়ার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীকে অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করতে চেয়েছেন বারবার। প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী জেনারেল কাসেম সুলেইমানিকে হত্যা করেন ট্রাম্প।
গত জুনে অপারেশন মিডনাইট হ্যামারে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকিও নিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার অপ্রতিরোধ্য সামরিক ক্ষমতা দেখাতে মত্ত হয়ে উঠেছেন। ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পরিবর্তে দেশটির ওপর সর্বাত্মক আক্রমণের সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের জন্য একটি বিশাল জুয়া ছিল।
মাদুরোকে অপহরণ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত
ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ছিল চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি। এদিন মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে মধ্যরাতে অপহরণ করে। ইরানে হামলার আগে এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এরপরই এপস্টাইন কেলেঙ্কারি সামনে আসায় ট্রাম্প প্রশাসন ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। এই সংক্রান্ত ফাইলগুলোতে ট্রাম্পের নাম ৩৮ হাজারেরও বেশি বার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সব অভিযোগ ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করেছেন।
নেতানিয়াহুর প্ররোচনা
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যুদ্ধবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে শীতকালীন হোয়াইট হাউস খ্যাত ‘মার-এ-লাগোতে’ নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে হামলার জন্য মার্কিন অনুমোদন চেয়েছিলেন। ট্রাম্প তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন। এ কারণেই পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সেই প্রতিশ্রুতি ইরানকে ধ্বংস করার জন্য একটি যৌথ হামলার প্রতিশ্রুতিতে রূপ নিয়েছিল।
অবশেষে ইরানে আঘাত
ইরানে অভিযানটি শুরু হয়েছিল ফ্লোরিডার সময় রাত ১.১৫ মিনিটে। আর ইরানের স্থানীয় সময় ছিল সকাল ৯.৪৫টা। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইতোমধ্যেই তার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তেহরান থেকে পালাতে চাননি। তিনি স্পষ্টতই আত্মসমর্পণের চেয়ে শাহাদাত পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু হয়তো সেই সকালে এমন হামলার আশা করেননি। সরকার ধরে নিয়েছিল রাতে আক্রমণ হবে। আকাশ থেকে ছোড়া ৩০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র খামেনির ভবনে আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে খামেনিসহ কয়েক ডজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। ১০০টিরও বেশি মার্কিন বিমান প্রাথমিক আক্রমণে অংশ নিয়েছিল। সেই সঙ্গে সমুদ্র থেকে ছোড়া হয় টোমাহক ক্ষেপণাস্ত্রও। এটি ছিল অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন। কিন্তু এখন ট্রাম্প আর এই প্রত্যাশা কমিয়ে দিয়েছেন।