ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। জ্বালানি খাতে ধাক্কার আশঙ্কা, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, প্রবাসী শ্রমবাজার, বেকারত্ব বৃদ্ধি, ডলারের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কাসহ নানা চ্যালেঞ্জে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। ফলে বাজার ও সরবরাহ-ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধ থেকে তৈরি হওয়া সংকট দেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এর মধ্যে আছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহে বিঘ্ন, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়া, প্রবাসী শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়া। উৎপাদন খরচ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরও অনেকটা নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। তারা জানায়, চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল মূল্য ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার মনে করে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ অবস্থানে থাকলে তা বাংলাদেশের বহিঃখাতের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে। এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো বিঘ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ফ্রেইট চার্জ, বিমা প্রিমিয়াম এবং পণ্য সরবরাহের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, এই পরিস্থিতিতে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহনে বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি সংকটের প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। যদি জ্বালানি সংকট তৈরি হয়, তবে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বা ‘প্রোডাকশন কস্ট’ বেড়ে যাবে। উৎপাদন খরচ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দাম বাড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে।
আইএমএফ ইতিমধ্যে পূর্বাভাস দিয়েছে যে সারা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির মাত্রা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানির অভাবে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে সমস্যার মুখে ফেলবে। সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি একটি বড় ধরনের চাপের সম্মুখীন হবে।
তিনি এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তি বা বিকল্প জ্বালানি উৎসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করেন।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন