মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে ওই অঞ্চলে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে পেন্টাগন। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা অত্যন্ত শক্তিশালী ‘টার্মিনাল হাই-অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড ব্যবস্থার কিছু অংশ জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
কেন এই আকস্মিক স্থানান্তর?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জর্ডানে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি থাড ব্যবস্থার অত্যন্ত মূল্যবান রাডার ইরান ধ্বংস করেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মূলত ইসরায়েল ও ইরানি ভূখণ্ডে পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন তেহরানের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক মাসে ইরান যে বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে, তা মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মজুত অনেকটাই কমে এসেছে। এই ঘাটতি পূরণ এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ সামাল দিতেই দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এই ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অস্বস্তি ও চীনের অবস্থান
২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় সিউলের দক্ষিণ পাশে সেওংজু বিমানঘাঁটিতে প্রথম থাড মোতায়েন করেছিল ওয়াশিংটন। তবে বর্তমানে সেখান থেকে লঞ্চার ও রাডার সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সিউল কিছুটা বিপাকে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং এক মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানান, মার্কিন বাহিনী তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে। সিউল এতে কিছুটা আপত্তি জানালেও কৌশলগত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনায় বেইজিং তাদের পুরনো অবস্থানেই অনড় রয়েছে। চীনের দাবি, থাড-এর রাডার ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী যে এটি দিয়ে চীনের অভ্যন্তরেও নজরদারি চালানো সম্ভব। ফলে এটি ওই অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করছে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এটি সরে যাওয়ায় বেইজিং কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, তবে স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা একে পূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখছে না।
থাড-এর কার্যকারিতা ও গুরুত্ব
মার্কিন প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তৈরি করা এই থাড ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। এটি ‘হিট-টু-কিল’ প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরেই শত্রুর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম। একেকটি থাড ইউনিটের (ব্যাটারি) দাম প্রায় ১০০ কোটি ডলার। বর্তমানে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাত্র আটটি এমন ইউনিট রয়েছে, যার বড় একটি অংশ এখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় নিয়োজিত হচ্ছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের বৈশ্বিক সামরিক বিন্যাস পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এর ফলে পূর্ব এশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা দেয়াল কতটা দুর্বল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক।