যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উপলক্ষে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘এনআরবি ওয়াল্ডওয়াইড। নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী এই মহোৎসবে জড়ো হন প্রবাসী বাঙালি, আন্তর্জাতিক অতিথি, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও মূলধারার মার্কিন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।
হাজারো বাঙালির জয়গানে মাতোয়ারা হয়ে উঠে টাইমস স্কয়ার। নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র টাইমস স্কয়ার যেন রূপ নিয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশে।
শনিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ২৭টি বর্ণিল পর্বে সাজানো এই উৎসব নিউইয়র্কে বাঙালির সাংস্কৃতিক উপস্থিতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
উৎসবের সূচনায় মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন করেন বিশ্বজিত সাহা, রোকেয়া হায়দার, হোসাইন কবির ও মহিতোষ তালুকদার তাপসসহ বিশিষ্টজনেরা। বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত হয় শুভেচ্ছা ও ভিডিও বার্তা।
বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে ব্র্যাড হলম্যান সিগাল, ডোনোভান রিচার্ডস জুনিয়র, গ্রেস মেং জন লিউয়ের নতুন বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে তোলে। এরপর কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দিন আবুল কালামের জন্মশতবার্ষিকীর গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। তোফাজ্জল লিটনের উপস্থাপনায় এই পর্বে বাংলা সাহিত্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের আবহে দিনের কর্মসূচির আবেগঘন সূচনা ঘটে। পরে কার্তিক চন্দ্রের উদ্বোধনী সংগীতে টাইমস স্কয়ার ভরে ওঠে বৈশাখের সুরে।
দিনের প্রথমভাগে গীতাঞ্জলির সংগীত, শিশুদের একক পরিবেশনা, অ্যালভান চৌধুরীর গান, রঞ্জনীর নৃত্য এবং চিত্রর সুরেলা উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। জীবন চৌধুরীর পরিবেশনায় ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ বিদেশি দর্শকের সামনে বাংলার লোক ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরে। টাইমস স্কয়ারের ডিজিটাল আলোকচ্ছটায় বাংলা গান ও লোককাব্যের স্মৃতি মিলেমিশে তৈরি হয় এক অনন্য আবহ।
উৎসবকে বৈশ্বিক মাত্রা দেয় নেপাল, লাওস ও থাই কমিউনিটির শিল্পীদের অংশগ্রহণ। তাদের পরিবেশনায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহুরঙা সংস্কৃতি বাংলা নববর্ষের মঞ্চকে আন্তর্জাতিক সম্প্রীতির প্রতীকে পরিণত করে। একইসঙ্গে ‘ছয় ঋতু’র পরিবেশনায় বাংলার প্রকৃতি, সময় ও জীবনদর্শনের নান্দনিক উপস্থাপনা দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে।
মধ্যাহ্নে বিশিষ্ট অতিথি ও গুণীদের সম্মাননা পর্বে বিদেশি অতিথি, সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি ও বিভিন্ন কমিউনিটির নেতারা অংশ নেন। ড. কল্লোল বসুর উপস্থাপনায় এই পর্বে বাংলা নববর্ষকে সাংস্কৃতিক, কূটনীতি ও প্রবাসী পরিচয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়। পরে রোকেয়া হায়দার ও বিশ্বজিত সাহার অংশগ্রহণে স্মারকগ্রন্থ উন্মোচন অনুষ্ঠান প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক যাত্রাকে দলিলবদ্ধ করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে রূপ নেয়।
বিকেলে নাটক জ্যোতি সংহিতা, বর্ণিল মঙ্গল শোভাযাত্রা, সলিল চৌধুরী স্মরণে সংগীত, রহমান টিটোর ‘দ্রোহের গান’, আড্ডা ও সৃষ্টি অ্যাকাডেমির নৃত্য, শাহ মাহবুবের লোকগান, ওড়িশি ডান্স অ্যাকাডেমির শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং মহানায়ক উত্তম কুমার স্মরণে বিশেষ পরিবেশনা উৎসবকে একের পর এক নতুন মাত্রা দেয়। বিশেষ করে, মঙ্গল শোভাযাত্রার সময় টাইমস স্কয়ার যেন ঢাকার চারুকলার এক বর্ণিল প্রতিরূপে পরিণত হয়।
সন্ধ্যার পর শিশুদের ‘শতকণ্ঠে বর্ষবরণ’ এবং পরে সিনিয়র শিল্পীদের সম্মিলিত পরিবেশনা ছিল দিনটির অন্যতম সেরা আকর্ষণ। যেমনি নতুন প্রজন্মের শিশুদের কণ্ঠে বাংলা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ যেমন ধ্বনিত হয়েছে, তেমনি সিনিয়র শিল্পীদের সম্মিলিত পরিবেশনায় উঠে এসেছে প্রবাসী জীবনের গভীর আবেগ ও স্মৃতি।
সবশেষে কলকাতার র্্তুপর্ণা ও ঢাকার নকুল কুমার বিশ্বাসের সমাপনী সংগীত ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে রাত ১০টায় শেষ হয় নিউইয়র্কে বাঙালির এই ঐতিহাসিক বর্ষবরণের উৎসব।
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকরা বলেন, টাইমস স্কয়ারে বাংলা নববর্ষ এখন শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বিশ্বে বাংলার সাংস্কৃতিক মর্যাদা, প্রবাসী ঐক্য এবং বহুসাংস্কৃতিক নিউইয়র্কে বাঙালির দৃশ্যমান শক্তির প্রতীক।
বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর এই আয়োজন আবারও প্রমাণ করল, বাঙালির উৎসব আজ বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত এক সাংস্কৃতিক শক্তি, যা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, ইতিহাস ও কূটনৈতিক সম্প্রীতির মাধ্যমে জাতিগত সীমানা অতিক্রম করেছে।