ফ্রান্সে রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জট কমাতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরো নুনেজের নেতৃত্বে নেওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রেফেকচুরগুলোর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিদেশিদের আইনগত অধিকার সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রক্ষণশীল দৈনিক লো ফিগারোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমে থাকায় অনেক বিদেশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন সম্পন্ন করতে না পেরে তাদের বৈধ অবস্থান ও অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রক্রিয়াকরণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে চায়।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের গড় সময় ৫৫ দিনে নামিয়ে আনা, যেখানে গত বছর এই সময় ছিল ১১৭ দিন। একই সঙ্গে কিছু প্রেফেকচুরে এই সময় ১২০ দিনেরও বেশি।
সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নবায়ন প্রক্রিয়ায় যেন কোনো বিদেশি শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন- এ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসীদের ক্ষেত্রে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে প্রেফেকচুরগুলোতে অতিরিক্ত ৫০০ অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক জনবল প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করবে।
পাশাপাশি জমে থাকা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০ লাখ ইউরো অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার আবেদন প্রক্রিয়াধীন। ২০২৫ সালে মোট ৯ লাখ ৫৫ হাজার রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ২ লাখ ৫ হাজার অর্থনৈতিক এবং ৩ লাখ ৬৬ হাজার পারিবারিক ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
প্রশাসনিক কাঠামো আরো কার্যকর করতে সরকার একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে সরকার জানিয়েছে, জালিয়াতির ঝুঁকি অনুযায়ী ফাইল যাচাইয়ের মাত্রা ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হবে। যদিও জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশিদের জন্য ব্যবহৃত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আএনইএফ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি ত্রুটি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং মানবিক সহায়তার অভাবে সমালোচিত হয়ে আসছে।
ফ্রান্সের অধিকার রক্ষাকারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সমস্যার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার বিদেশি অনিচ্ছাকৃতভাবে অনিয়মিত অবস্থায় চলে যাচ্ছেন, যদিও তাদের পূর্বে বৈধ রেসিডেন্স পারমিট ছিল। বর্তমানে সংস্থাটিতে প্রাপ্ত অভিযোগের প্রায় ৪৫ শতাংশই বিদেশিদের অধিকারসংক্রান্ত।
অভিযোগ রয়েছে, পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে অনেকেই সামাজিক সুবিধা, কর্মসংস্থান এবং বসবাসের অধিকার হারান, যা তাদের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
চলতি মাসের ১০ এপ্রিল ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কনসেই দেতা ‘আএনইএফ’ প্ল্যাটফর্মের ত্রুটি নিয়ে শুনানি করেছে। সেকুর ক্যাথলিক ও এমাউসসহ ১০টি মানবাধিকার সংগঠন এই বিষয়ে আদালতে আবেদন করেছে।
শুনানিতে বলা হয়, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং এটি সরাসরি সামাজিক সেবা ও মৌলিক অধিকার প্রাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে সেই সব অভিবাসীদের ক্ষেত্রে, যারা ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, আর্থিক দুর্বলতা এবং কঠিন অভিবাসন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আলিস মেইয়ের-বুরদো আদালতে বলেন, ‘আএনইএফ’-এর কারিগরি ত্রুটি অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের আইনগত অবস্থানকে অকার্যকর করে তুলছে।
অন্যদিকে সরকারি কৌঁসুলি আদালতকে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। বিশেষ করে আবেদন জমা ও নবায়ন প্রক্রিয়া চলমান থাকার প্রমাণপত্র প্রদানের ক্ষেত্রে, যা বৈধ অবস্থান বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ফ্রান্সে প্রায় ৪৫ লাখ বিদেশির বৈধ রেসিডেন্স পারমিট ছিল, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ।