দেশের বাজারে দেশীয় পদ্মার ইলিশের উচ্চ চাহিদার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে আমদানি করা সস্তা ইলিশ বেশি দামে বিক্রির প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েছেন। কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে তিন লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশ আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে প্রায় ২৯ হাজার কেজি এবং আগস্ট মাসে প্রায় তিন লাখ ২৩ হাজার কেজি মাছ দেশে এসেছে। ফেমাস ট্রেডার্স ও সততা ফিস ফিডসহ মোট ২২ জন আমদানিকারক এলসির মাধ্যমে এই মাছগুলো দেশে নিয়ে এসেছেন। সরকারি শুল্ক, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে এসব আমদানিকৃত ইলিশের পেছনে প্রতি কেজির ক্রয়মূল্য প্রায় ৫১৪ টাকা পর্যন্ত পড়ে। অথচ পরবর্তীতে এই মাছগুলোই বেনাপোল, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে চৌদ্দশ থেকে আঠারোশ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
আমদানিকৃত এসব বিদেশি ইলিশ দেখতে পুরোপুরি দেশি ইলিশের মতোই হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা সহজেই এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। বাজারে গিয়ে বেশি দাম দিয়ে দেশি বা পদ্মার ইলিশ মনে করে কিনলেও বাড়িতে রান্নার পর ক্রেতারা বুঝতে পারছেন যে মাছগুলোতে কাঙ্ক্ষিত স্বাদ ও সুগন্ধ নেই। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা এগুলোকে চাঁদপুর, বরিশাল বা চট্টগ্রামের সুস্বাদু ইলিশ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন এবং কেউ কেউ আবার উপহাস করে এগুলোকে রোহিঙ্গা ইলিশ বলেও প্রচার করছেন। অথচ বর্তমান বাজারে দেশি এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম যেখানে তিন হাজার টাকার ওপরে, সেখানে আকারে বড় হওয়া সত্ত্বেও এই বিদেশি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে। কম দামের আকর্ষণে সাধারণ ক্রেতারা এই মাছ কিনলেও প্রতারিত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে আমদানিকারকরা দাবি করছেন যে তারা সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে এলসি খুলে এবং যথাযথ শুল্ক পরিশোধ করেই ভারত ও মিয়ানমার থেকে এই ইলিশগুলো আমদানি করছেন। বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন জানিয়েছেন যে কাস্টমসের ছাড়পত্র ও বন্দর শুল্ক নেওয়ার পরেই কেবল আমদানিকারকদের মাছগুলো খালাস দেওয়া হয়েছে এবং তারা বৈধভাবেই এগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়েছেন। বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলমও নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিটি চালান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করার পরেই কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। তবে আমদানিকারকদের দাবি, তারা কেবল আড়তদারদের কাছে মাছ বিক্রি করেন এবং খুচরা বিক্রেতারা কোন পরিচয়ে বা কী দামে তা বিক্রি করছেন সেটার দায় তাদের নয়।
বিদেশি এই সস্তা ইলিশ অবাধে বাজারে প্রবেশ করায় বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন প্রকৃত দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন যে কম দামে বড় আকারের বিদেশি মাছ বাজারে চলে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, যার ফলে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারা মনে করছেন যে আমদানিকারক থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত একটি চক্র এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত রয়েছে এবং প্রশাসন অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই ধরনের জালিয়াতি রোধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ক্রেতা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।