মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আঁচ সরাসরি গিয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। সম্প্রতি সৌদি আরবে হুথি বিদ্রোহীদের নতুন করে চালানো হামলা এবং পারস্য উপসাগরে ইরানের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করেছে। একই সময়ে সৌদি আরবের কৌশলগত তেল পাইপলাইন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের শঙ্কার সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক শেয়ার ও পণ্য বাজারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যায়, যেখানে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার মূল্য ১ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১০৭ ডলারে গিয়ে ঠেকে। পাশাপাশি মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের অক্টোবরের ফিউচার ১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০২ দশমিক ৬৮ ডলারে লেনদেন হয়েছে। মূলত তেল উৎপাদক অঞ্চলে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে যে, বিদ্রোহী বাহিনী সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সাহায্যে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার পাশাপাশি দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এই পাইপলাইনটি বন্ধ থাকায় লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের সামরিক বাহিনী ওই জলসীমায় একটি উন্নত মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করায় তেলের নিরাপদ পরিবহন নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় সংঘাতের আবহ আরও ঘনীভূত করেছে। প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের মাত্রা আরও তীব্র রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ তৈরি হতে পারে। শ্রী-কুমার গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান কোমল শ্রী-কুমার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন যে, চলমান এই সংকটের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার শুল্কযুদ্ধ যুক্ত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সাধারণ মানুষের জীবনে খরচের বোঝা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।