October 5, 2026, 3:03 am

দেশসেরা এক শিক্ষকের গল্প

Reporter Name
  • Update Time : Monday, October 5, 2026
  • 18 Time View

সকাল থেকেই এক অন্যরকম কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল নয়টা বাজতেই বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে ভেতরে প্রবেশ করান প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং শারীরিক কসরতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রাত্যহিক প্রাতঃসমাবেশ পর্ব। সুশৃঙ্খলভাবে শিক্ষার্থীরা যার যার শ্রেণিকক্ষমুখী হওয়ার পর প্রধান শিক্ষক নিজ দায়িত্বে প্রতিটি ক্লাসে পাঠদানের জন্য শিক্ষক পাঠিয়ে থাকেন। শৃঙ্খলা আর নিয়মের এমন কঠোর অনুশাসনের মধ্য দিয়েই মূলত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘকাল ধরে এই বিদ্যালয়টিকে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই প্রধান শিক্ষক। তাঁর দূরদর্শী ও দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের কারণেই বিদ্যালয়টি স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সর্বশেষ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায় দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগেও তিনি জীবনে বহুবার উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা প্রধান শিক্ষকের সম্মান অর্জন করেছেন। এই সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ১২ বার উপজেলার, আটবার জেলার এবং দুইবার বিভাগের সেরা প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

বিদ্যালয়ের সার্বিক সফলতার পেছনের কারিগর বি আর বিলকিস মূলত ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে কঠোর পরিশ্রম ও মেধার জোরে দুই হাজার তিন সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ লাভ করেন তিনি। তাঁর সুযোগ্য পরিচালনায় বর্তমানে ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার চমৎকার পরিবেশ বিরাজ করছে। এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে এক হাজার বিশ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং প্রতিদিনের উপস্থিতির হার প্রায় নিরানব্বই শতাংশের কাছাকাছি থাকে। তেরোজন শিক্ষককে নিয়ে গঠিত দক্ষ শিক্ষক দল নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষার মান বাড়াতে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের তিনটি স্তরে অর্থাৎ উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া ভাগে চিহ্নিত করা হয়। এরপর শিক্ষকদের সহযোগিতায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয় যাতে কোনো শিশুই পড়াশোনায় পিছিয়ে না পড়ে। শুধু শ্রেণিকক্ষের পড়ালেখাই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্প বলার নিয়মিত চর্চা করানো হয়। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব পরিচালিত হয় এবং নিয়মিতভাবে অলিম্পিয়াড ও বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বাসায় গিয়েও পড়াশোনার খোঁজ নেন এই প্রধান শিক্ষক, যার ফলে অভিভাবকদের সঙ্গেও বিদ্যালয়ের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। গত বছর এই বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ফলাফলও ছিল অত্যন্ত চমৎকার। পরীক্ষার ফলাফলের এই ধারাবাহিক সাফল্য প্রমাণ করে যে এখানকার শিক্ষাদান পদ্ধতি কতটা ফলপ্রসূ ও আধুনিক।

প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস তাঁর এই অর্জনের কৃতিত্ব নিজের একার কাঁধে না চাপিয়ে পুরো শিক্ষা পরিবারকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি মনে করেন, এই গৌরবময় সাফল্য বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। এই অর্জন তাঁকে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে আরও বেশি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও সহকর্মীরাও তাঁর এই নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সহকারী শিক্ষক শামীমা আক্তার জানান যে প্রধান শিক্ষকের শ্রেষ্ঠত্বের পেছনে রয়েছে তাঁর লৌহকঠিন শৃঙ্খলা ও শিক্ষাবান্ধব মনমানসিকতা। সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করা এই মানুষটি নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে বিদ্যালয়ের কাজেই বেশি সময় ব্যয় করেন। আরেক শিক্ষক মাহমুদা আক্তার উল্লেখ করেন যে তিনি নিজে এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে সেখানেই শিক্ষকতা করছেন। তাঁর চোখের দেখা সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষক হলেন বিলকিস, যিনি সর্বদা নতুন ও উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে কাজ করেন। শিক্ষক কবির হোসেনের মতে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা এবং নতুন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বিদ্যালয়টিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও তাদের প্রধান শিক্ষকের এমন মাতৃসুলভ স্নেহ ও যত্নের কথা আনন্দের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৌসিফ হোসাইন জানায় যে প্রধান শিক্ষক তাদের খুব যত্ন নেন এবং তারা নিজেরাও ছাদবাগান ও স্কুল পরিচ্ছন্নতার কাজে তাঁকে সাহায্য করে থাকে। এছাড়া অভিভাবকদের মধ্যেও এই প্রধান শিক্ষককে নিয়ে রয়েছে গভীর সন্তুষ্টি ও আস্থা। পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা সাথী আক্তার জানান যে প্রধান শিক্ষক সরাসরি তাঁদের বাসায় এসে ছেলের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন এবং সন্তান অন্যমনস্ক হয়ে সময় নষ্ট করছে কি না সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখেন। শিক্ষকের এই ব্যক্তিগত তদারকি ও আন্তরিকতা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করে তোলে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে বি আর বিলকিস এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের ক্লাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তিনি শিক্ষকদের নিয়ে নিয়মিত সভা করেন এবং শিক্ষা কার্যক্রমের মান কীভাবে আরও উন্নত করা যায় সে বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। অনেক সময় প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন। তাঁর এই সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফলে ঝরে পড়ার হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং শিক্ষার হার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাঁর এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বারবার পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই সাফল্য শুধু ভট্টপুর মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্যই নয়, বরং সমগ্র দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক কীভাবে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও ভালোবাসার মাধ্যমে একটি পুরো প্রতিষ্ঠানের চিত্র বদলে দিতে পারেন, তার বাস্তব প্রমাণ এই প্রধান শিক্ষক। তাঁর এই কর্মতৎপরতা আগামী দিনের প্রজন্মের জন্য এক বিশাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। প্রাথমিক শিক্ষার এই দীক্ষাগুরু প্রমাণ করেছেন যে সঠিক নেতৃত্ব, ভালোবাসা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। তাঁর হাত ধরেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং শিশুরা নৈতিকতা ও শিক্ষায় আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © dainikkhobor.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com