২০২৪ সালে জাপানে নিয়োজিত মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে একটি জরুরি নির্দেশ আসে। মাঝপথে তাদের পাঠানো হয় মধ্যপ্রাচ্যে। লক্ষ্য ছিল ইরান ও তার প্রক্সিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা সেটিই ছিল প্রথম। সেখানে এটি টানা পাঁচ মাস অবস্থান করে।
পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে মোতায়েন থাকা শত শত সেনা এবং বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র নিয়ে ৭৩টি সি-১৭ বিমানে করে কাতারে পৌঁছায় মার্কিন বাহিনী। জুন মাসে সেখানে ইতিহাসে একক বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মহড়া চালায় তারা। অথচ এই সেনাদের মূল প্রশিক্ষণই ছিল চীন ও উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলা করার জন্য।
বর্তমানে মার্কিন সামরিক বাহিনী চীনকেই তাদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু ওয়াশিংটন বারবার অন্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতি এর সবশেষ উদাহরণ। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানগুলোকে এক জায়গায় টেনে আনছে।
সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই মার্কিন বাহিনী প্রায় ২ হাজার লক্ষ্যবস্তুর বিপরীতে বিশাল আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে সাধারণ বোমা প্রচুর থাকলেও টমাহক বা আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মতো উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ১ হাজার মাইলের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে তাদের মনোযোগ এশিয়ায় সরানোর কথা বললেও বাস্তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের জটিলতায় বারবার আটকে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো টম কারাকো বলেন, এটি একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের জন্য যা মজুত রাখা প্রয়োজন, সেন্টকম তা ব্যবহার করে ফেলছে। ইরানকে হারানোর মতো অস্ত্র আমাদের আছে, কিন্তু সমস্যা হলো এটি চীনের বিরুদ্ধে আমাদের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সক্ষমতা ইরানের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। চীনের রয়েছে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার, শক্তিশালী নৌবহর এবং অতুলনীয় উৎপাদন ক্ষমতা। তারা তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ করতে চায় এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সাবেক উপ-সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব মাইকেল হোরোভিটজ বলেন, ইরানের কাছে যা আছে, চীনের কাছে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি এবং উন্নত মানের অস্ত্র রয়েছে। তাদের হারাতে আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন।
এদিকে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন অস্ত্রাগারে টান পড়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো সতর্ক করে বলেছেন, উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের এই ব্যবহার এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
গত বছর ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আমেরিকা দুটি থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরায়েলে পাঠায় এবং ১৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এটি পেন্টাগনের কেনা মোট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় হচ্ছে।
বর্তমান প্রশাসনের ওয়ার পলিসি বিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি মনে করেন, বিশ্বজুড়ে সক্রিয় থাকার একটি প্রচ্ছন্ন খরচ আছে। তার মতে, অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়।
শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, মার্কিন নৌবাহিনীর ওপরও চাপ বাড়ছে। ভারত মহাসাগর বা দক্ষিণ চীন সাগরে থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বা ইউএসএস কার্ল ভিনসনকে বারবার মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিতে হচ্ছে। এমনকি বৃহত্তম রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকেও আটলান্টিক ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের মধ্যে বারবার আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক থমাস শুগার্ট বলেন, নৌবাহিনীর ওপর এই অতিরিক্ত চাপের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। আমাদের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো এমনিতেই চাপে আছে, এই পরিস্থিতি সেই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলবে।
পেন্টাগন এখন দ্রুত তাদের মজুদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গত জানুয়ারিতে লকহিড মার্টিনের সঙ্গে নতুন চুক্তি হয়েছে, যাতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা বছরে থাড ৯৬ থেকে বাড়িয়ে ৪০০ এবং প্যাট্রিয়ট ৬০০ থেকে ২ হাজারে উন্নীত করা যায়। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও অন্তত সাত বছর সময় লাগবে।