ঈমান কি শুধু কিছু বিশ্বাসের নাম, নাকি এটি মানুষের হৃদয় ও জীবনের গভীরে প্রবাহিত এক বর্ণনাতীত অনুভূতি? ইসলাম ঈমানকে নিছক মতাদর্শ হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের আত্মিক স্বাদ, অন্তরের প্রশান্তি ও নৈতিক দৃঢ়তার উৎস হিসেবে চিত্রিত করেছে। এই ঈমানি স্বাদের কথা বলতে গিয়েই রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক হাদিস উচ্চারণ করেছেন, যা যুগে যুগে মুমিনের আত্মাকে আলোড়িত করেছে।
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে— (১) আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) ব্যক্তির নিকট অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হওয়া; (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা; (৩) কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা।’ (বুখারি, হাদিস : ১৬)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈমানের একটি মানসিক ও আত্মিক মানচিত্র এঁকে দিয়েছেন।
এখানে ঈমানের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে ভালোবাসা, ঘৃণা এবং অগ্রাধিকারবোধকে, যা মানুষের অন্তরের গভীরতম স্তরকে নাড়া দেয়। ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারার প্রথম গুণ হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসা। কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘বলুন, যদি তোমাদের পিতা, পুত্র, ভাই, স্ত্রী, গোত্র, অর্জিত সম্পদ এবং যে ব্যবসার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা করো—এসব যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এবং তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তবে আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষা করো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৪)
এই আয়াত ও হাদিস একসঙ্গে আমাদের জানিয়ে দেয় যে ঈমানের দাবি এই নয় যে মানুষ পার্থিব সম্পর্ক বা সম্পদ ভালোবাসবে না; বরং যখন আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশের সঙ্গে দুনিয়ার টানাপোড়েন সৃষ্টি হবে, তখন মুমিনের হৃদয় কোন দিকে ঝুঁকবে; সেই পরীক্ষাই আসল।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘যে ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার অধীন নয়, তা শেষ পর্যন্ত শাস্তির কারণ হয়।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড-১০)
ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারার দ্বিতীয় গুণ হচ্ছে কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। এটি ইসলামের সামাজিক নৈতিকতার মূলভিত্তি। এই ভালোবাসা কোনো স্বার্থ, রক্তের সম্পর্ক বা পার্থিব লাভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং তা ঈমান, তাকওয়া ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা, এটাই ঈমানের সবচেয়ে মজবুত বন্ধন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৮১)
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা মানে হলো কারো আনুগত্য, নৈতিকতা ও দ্বিনের কারণে তাকে ভালোবাসা। এতে সমাজে হিংসা নয়, বরং ভ্রাতৃত্ব ও আস্থার পরিবেশ গড়ে ওঠে (শরহে সহিহ মুসলিম)
ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারার তৃতীয় গুণটি হচ্ছে ঈমানের ওপর অবিচল থাকার দৃঢ়তা লালন করা। যা প্রকাশ করা হয়েছে, কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা, এটি শুধু ভয় নয়, বরং ঈমান হারানোর কুফল সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনার পর কুফরি করে, অতঃপর কুফরিতেই বৃদ্ধি পায়, তাদের তওবা কখনো গ্রহণ করা হবে না।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৯০)
ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন যে ঈমানের স্বাদ আস্বাদনকারী ব্যক্তি সত্যকে চিনে নেওয়ার পর আর কখনো অজ্ঞতার অন্ধকারে ফিরে যেতে রাজি হয় না। (তাফসিরে ইবনে কাসির)
এই তিনটি গুণ একত্রে মানুষের অন্তরে এমন এক ঈমানি স্বাদ সৃষ্টি করে, যা বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। দুনিয়ার সুখ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ঈমানের স্বাদ স্থায়ী প্রশান্তির জন্ম দেয়। এ জন্যই সাহাবায়ে কেরাম কঠিন ত্যাগ, দারিদ্র্য ও নির্যাতনের মধ্যেও ঈমান ছাড়েননি। কারণ তাঁরা ঈমানের সেই স্বাদ পেয়েছিলেন।
আজকের ভোগবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজে এই হাদিস নতুন করে আমাদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়; আমাদের ভালোবাসা, আমাদের ঘৃণা এবং আমাদের অগ্রাধিকার কি সত্যিই আল্লাহকেন্দ্রিক? যদি তা হয়, তবে ঈমান আর শুধু বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা হয়ে উঠবে জীবনের চালিকাশক্তি।
ঈমানের এই স্বাদই একজন মানুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়, চরিত্রে আনে দৃঢ়তা, সমাজে আনে নৈতিক ভারসাম্য এবং জীবনে এনে দেয় এমন প্রশান্তি, যা দুনিয়ার কোনো অর্জন দিয়ে কেনা যায় না।