অর্থনীতি ডেস্ক: মানবজীবনে বেঁচে থাকার জন্য পুষ্টিকর খাবারের জোগান যেমন জরুরি, তেমনি সেই খাবার প্রস্তুতের জন্য রান্নার জ্বালানিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সময়ে শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে মফস্বলের লাখ লাখ পরিবারের কাছে রান্নার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি। পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা সব জায়গায় না থাকায় একসময় এই সিলিন্ডার গ্যাস অনেক পরিবারের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ধারাবাহিক ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই সাশ্রয়ী বিকল্প জ্বালানি এখন নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম লাগাতার বাড়ায় সাধারণ মানুষ চরম দুশ্চিন্তা ও বিপাকে পড়েছেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি সম্প্রতি বেসরকারি খাতের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়ে নতুন দর নির্ধারণ করেছে। এর ফলে দেশের বাজারে এই প্রথম একটি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত মূল্য দুই হাজার টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে দফায় দফায় দাম বাড়ায় সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে টান পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের এলপিজি বাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার অজুহাতে দেশের বাজারে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধির এই পরিস্থিতির পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হলো সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারের বিস্তর ফারাক। অভিযোগ রয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিংবা পরিবহনের অজুহাতে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। যথাযথ বাজার তদারকি এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এছাড়া অনেক সময় ভোক্তারা নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস কিনেও সঠিক পরিমাণ বা পূর্ণ ওজনের সিলিন্ডার পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন রয়েছে।
গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ার কারণে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের মাসিক সংসারের বাজেটে। একটি সিলিন্ডারের পেছনে দুই হাজার টাকার বেশি খরচ করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে খাদ্য, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার মতো অতি জরুরি খাতের ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি জ্বালানি খাতের সংকট নয়, এটি সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই সাধারণ মানুষের কাঁধ থেকে এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে হলে নিয়মিত ও কার্যকর বাজার অভিযান পরিচালনা করতে হবে যাতে নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে আমদানির উৎস ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রান্নার জ্বালানি নিশ্চিত করা সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।