পটুয়াখালী প্রতিনিধি
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিবর্তিত কর্মবাজারে টিকে থাকতে তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সফট স্কিল, যোগাযোগ দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু একাডেমিক সার্টিফিকেট নয়, কর্মসংস্থানের জন্য বাস্তব দক্ষতা অর্জনকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তারা।
গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর) পটুয়াখালীতে e-Learning & Earning Ltd.-এর উদ্যোগে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও পরিবর্তিত পেশা: প্রযুক্তি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও ভবিষ্যৎ কর্মজগতের প্রস্তুতি’ শীর্ষক ফেসবুক লাইভ আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পটুয়াখালী জেলা আইসিটি অফিসার মো. সবুজ তালুকদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন e-Learning & Earning Ltd.-এর বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কিশোর চন্দ্র বালা। আলোচক হিসেবে ছিলেন AI প্রশিক্ষক মিয়া মোহাম্মদ তাহমিদ ইসলাম। অনুষ্ঠানে সফল প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে তাজমিরান জাহান শিরিন ও মো. নাজমুল হোসেন নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষক সৈয়দ ফেরদৌস মাহমুদ রাকিব।
প্রধান অতিথি মো. সবুজ তালুকদার বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের প্রথমেই বেসিক কম্পিউটার বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। কম্পিউটারের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের পর গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তিনি আগ্রহী তরুণদের জেলা আইসিটি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাম, ফোন নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে প্রশিক্ষক তৈরির মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
জেলা আইসিটি অফিসার বলেন, উপজেলা পর্যায়ের অনেক দরিদ্র পরিবারের তরুণ-তরুণীর পক্ষে জেলা বা বিভাগীয় শহরে এসে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হয় না। তাই তাদের নিজ নিজ এলাকায় প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জেলা আইসিটি অফিসের উদ্যোগে উপজেলা পর্যায়ে নতুন ব্যাচ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফ্রিল্যান্সিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরপরই আয় শুরু হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। এ পেশায় সফলতার জন্য ধৈর্য, নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, ভালো প্রোফাইল ও যোগাযোগ দক্ষতা প্রয়োজন। একটি সার্টিফিকেট সুযোগের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে সহায়তা করলেও বাস্তব দক্ষতা ছাড়া সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
বিশেষ অতিথি কিশোর চন্দ্র বালা বলেন, শিল্প বিপ্লবের প্রতিটি পর্যায়েই নতুন প্রযুক্তিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রমাণ হয়েছে, প্রযুক্তি শুধু মানুষের কাজ কেড়ে নেয়নি; বরং কাজকে সহজ করেছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। এখনকার প্রতিযোগিতা শুধু প্রচলিত জ্ঞান বা শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তথ্য, প্রযুক্তি, চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ ও সফট স্কিলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের নিয়মিত শেখার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। বইয়ের পাশাপাশি PDF, অডিও, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখন সহজেই জ্ঞান অর্জন করা যায়। হাতে থাকা মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারকে শুধু বিনোদনের জন্য নয়, জ্ঞান অর্জন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে AI-কে অবহেলা না করে এর সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
কিশোর চন্দ্র বালা বলেন, একজন শিক্ষার্থী জীবনের দীর্ঘ সময় একাডেমিক শিক্ষায় ব্যয় করলেও শুধু সার্টিফিকেট কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয় না। একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিষয়ে বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তার ভাষায়, কর্মবাজারে শুধু ‘আমি কী পড়েছি’ তা নয়, ‘আমি কী করতে পারি’—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
e-Learning & Earning Ltd.-এর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরে বিশেষ অতিথি জানান, সরকারি প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় তরুণদের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের বাইরে আগ্রহীদের জন্যও স্বল্প খরচে বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় প্রতি তিন মাসে প্রায় ৬০০ জন এবং বছরে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, বেসিক হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্কিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও এডিটিং, কমিউনিকেটিভ ইংলিশ, ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ও সফট স্কিল।
এ ছাড়া AI-ভিত্তিক প্রশিক্ষণে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, AI কনটেন্ট ক্রিয়েশন, জেনারেটিভ AI টুলস, AI প্রোডাক্টিভিটি, ডেটা অ্যানালাইসিস ও AI ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে পটুয়াখালীর সফল প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্ন অর্জনের তথ্য তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, জেলার প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে মারুফা আমিন, তাজমিরান জাহান শিরিন, নূর হোসেন মৃধা, মো. নাজমুল হোসেন ও ইমামুল হক ফ্রিল্যান্সিং ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বিশেষ অতিথি জানান, গত ১ অক্টোবর ভোলায় অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে পটুয়াখালীর সফল প্রশিক্ষণার্থী মারুফা আমিনসহ জেলার কয়েকজন সফল ফ্রিল্যান্সারকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪০০ প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২৮ জন নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন এবং তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা আয় করেছেন।
অনুষ্ঠানের আলোচক ও AI প্রশিক্ষক মিয়া মোহাম্মদ তাহমিদ ইসলাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, AI-কে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে কাজের সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কনটেন্ট তৈরি, ডিজাইন, গবেষণা, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ফ্রিল্যান্সিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে AI-ভিত্তিক দক্ষতার নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সফল প্রশিক্ষণার্থী তাজমিরান জাহান শিরিন ও মো. নাজমুল হোসেন তাদের প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তারা জানান, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশন, কাজ উপস্থাপন, পোর্টফোলিও তৈরি ও ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পেয়েছেন। নিয়মিত অনুশীলন, ধৈর্য এবং নিজের দক্ষতা উন্নয়নের ধারাবাহিকতাই তাদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
তাদের মতে, নতুনদের জন্য শুরুতে কাজ পাওয়া চ্যালেঞ্জিং হলেও নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন, নিয়মিত অনুশীলন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বক্তারা পটুয়াখালীসহ বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণের সুযোগ না পাওয়া তরুণদের জন্য স্বল্প খরচে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, প্রশিক্ষণ একজন তরুণকে সুযোগের পথ দেখাতে পারে; কিন্তু সেই সুযোগকে সফলতায় রূপ দিতে প্রয়োজন আন্তরিকতা, ধৈর্য, পরিশ্রম, নিয়মিত শেখার মানসিকতা এবং বাস্তব দক্ষতা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে তরুণদের সময়ের পরিবর্তনকে গ্রহণ করে নিজেদের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সমৃদ্ধ হওয়ার এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।