মোঃ মাইন উদ্দিন
ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই কমছে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়াবহ অপরাধের বিস্তার আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা- কেউই আজ নিরাপদ নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে শিশুও এই বর্বরতার শিকার হচ্ছে। এ বাস্তবতা শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের সমাজের গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
শিক্ষা ও সাংবাদিকতার সুবাদে অনেক সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধর্ষণ মামলার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী পড়ার সুযোগ হয়েছে। সেখানে কন্যাশিশু, ছেলে শিশু এবং বয়স্ক নারীর ওপর সংঘটিত নির্মম নির্যাতনের বিবরণ রয়েছে। এসব ঘটনার বর্ণনা শুধু ভয়াবহ নয়, একই সঙ্গে সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিকৃত মানসিকতার একটি অস্বস্তিকর চিত্রও তুলে ধরে।
ধর্ষণ মামলার আসামিরা সামাজিক অবস্থান, শিক্ষা কিংবা পেশায় ভিন্ন হলেও তাদের আচরণে কিছু অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই নিজেদের অপরাধের ব্যাপারে বিস্ময়করভাবে নির্লিপ্ত। লজ্জা, অনুতাপ বা অপরাধবোধের ছাপ তাদের আচরণে খুব একটা দেখা যায় না। বরং অনেক সময় তারা অবলীলায় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে। যেন ভয়াবহ এই অপরাধও তাদের কাছে খুব সাধারণ একটি ঘটনা।
একটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। মাত্র ১৩ মাস বয়সী এক শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তির জবানবন্দী পড়েছিলাম। বিচারক জানতে চেয়েছিলেন, তার পরিবারে কে কে আছে। উত্তরে সে জানিয়েছিল, মাত্র দুই মাস আগে তার বিয়ে হয়েছে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী বাড়ির রান্নাঘরে রান্না করছিলেন। বিচারক আরও জানতে চান, শিশুটি কি খালি গায়ে ছিল? সে জানায়, শিশুটি জামা-হাফপ্যান্ট পরা অবস্থাতেই ছিল। হঠাৎ শিশুটিকে দেখে তার ‘মাথা কাজ করেনি’- এমনই ছিল তার ব্যাখ্যা।
আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, এক ছেলে শিশুকে নির্যাতনকারী ব্যক্তি ছিল শিশুটির দাদার বন্ধু- অর্থাৎ বয়সে প্রায় দাদার সমান। সে শিশুটিকে পাশের জমি থেকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিল। পথে একটি বাঁশঝাড় দেখে তার মনে কু-চিন্তার উদয় হয় এবং সেখানেই ঘটে যায় নৃশংস ঘটনা।
এসব ঘটনা পড়তে পড়তে প্রশ্ন জাগে- এমন অপরাধ কেন বাড়ছে? সমস্যার মূল কোথায়?
সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, নৈতিক মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয়। পরিবার ও সমাজে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং আত্মসংযমের শিক্ষা আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা দ্রুত বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় তাদের মধ্যে ভয় বা প্রতিরোধের মনোভাব তৈরি হয় না।
তৃতীয়ত, সামাজিক নীরবতা ও লজ্জাবোধও বড় একটি কারণ। অনেক পরিবার সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে এমন ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। এই নীরবতাই পরোক্ষভাবে অপরাধীদের সাহস জোগায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- শিশুদের নিরাপত্তা ও সচেতনতা নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও পর্যাপ্ত আলোচনা হয় না। অনেক শিশু জানেই না কোন আচরণ বিপজ্জনক বা অনুচিত। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
এসব ঘটনা যখন গণমাধ্যমে দেখি বা পড়ি, তখন সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি হয়। একজন অভিভাবক হিসেবে এসব অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাই সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়ে এখন আর সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না।
বাস্তবতা হলো- শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবাইকে মিলেই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। অভিভাবকদের সতর্কতা, সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ- এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর না হলে এমন অপরাধ প্রতিরোধ করা কঠিন।
কারণ, যে সমাজ তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজের ভবিষ্যৎও নিরাপদ থাকে না। তাই এখনই সময়- নীরবতা ভেঙে সচেতন হওয়ার, মানবিক মূল্যবোধকে পুনরুদ্ধার করার এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার। শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।