সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেছেন, পরিবারের নিরাপত্তায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বর্তমান সরকারের একটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি। রোববার (১ মার্চ) ঢাকায় বনানী কড়াইল বস্তি ও সাততলা বস্তি পরিদর্শন উপলক্ষ্যে টিএনটি বালক বিদ্যালয় আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীর অধিকার ও নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করন, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিবারগুলোকে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেয়া হবে।
এ সময় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ ও মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬ প্রণয়ন করেছে।
তিনি বলেন, এই কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে প্রচলিত ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ এবং উল্লেখযোগ্য শতাংশ প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার মতো ত্রুটিগুলো দূর করে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।
তিনি বলেন, এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তর করা।
তিনি বলেন, সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ স্কোরিং ব্যবহার করা হবে। পাইলটিং পর্যায়ে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে ১ম, ২য় ও ৩য় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সময় অন্তর দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে দারিদ্রের এ ধাপ পুন:নির্ধারণ করা যাবে। গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারিত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই কার্ডটি সরাসরি পরিবারের ‘মা’ বা ‘নারী প্রধান’ সদস্যের নামে ইস্যু হবে।
পাইলট কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ ‘জিটুপি’ (এ২চ) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ (ডিএসআর)-এ স্থানান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ভবিষ্যতে একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলোও পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আনুষঙ্গিক খরচ বহন করবে, তবে ডাটা সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার একটি লক্ষ্যমাত্রা এই গাইডলাইনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সার্বিক তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি নীতি নির্ধারণ করবে এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কারিগরি ও ডাটা ম্যানেজমেন্ট কমিটি সার্বিক তত্ত্বাবধান করবে। উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে পৃথক বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৪টি ভিন্ন বৈচিত্র্যের এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি, মিরপুর অলিমিয়ারটেক বস্তি ও বাগানবাড়ী বস্তি, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, বান্দরবানের লামা, সুনামগঞ্জের দিরাই এবং ঠাকুরগাঁও সদর মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্রের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
পরে মন্ত্রী কড়াইল বস্তি এবং সাততলা বস্তি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে বস্তিতে বসবাসকারী বস্তিবাসীদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।