সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা ও জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন, অর্থপাচার, অন্যান্য দুর্নীতিসহ এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে দুদক এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুদকে যেকোনো অভিযোগ এলে তা যাচাই-বাছাই কমিটি দ্বারা যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ১০০ মার্কের মাকিং করা হয়। কোনো অভিযোগ ৮০ মার্ক পেলে তা পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়।’
নাম প্রকাশে অচ্ছুিক দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে।
এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দুদকে জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধানযোগ্য হলে তা অবশ্যই অনুসন্ধান করা হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। দুদকের যাচাই-বাছাই কমিটি রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।’
আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যত অভিযোগ : সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন এবং অন্যান্য দুর্নীতি। অভিযোগে বলা হয়, আসিফ নজরুল জামিন বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে একটি শিল্প গ্রুপের সিইও জালিয়াতির মাধ্যমে ভাই ও বোনের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন। ছোট বোন তার বিরুদ্ধে মামলা করে। পিবিআই মামলা তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণ পেয়ে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে ভিআইপি আসামিকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
গান বাংলা টেলিভিশনের তাপসের জামিনেও বিপুল অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে আসিফ নজরুল ক্ষমতার ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে বহু জামিন বাণিজ্য করেন।
আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগও আনা হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে আসিফ নজরুল ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নিতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সাব রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। আবার তাঁর বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও জমা পড়েছে দুদকে।
নিজেকে নির্দোষ দাবি : এদিকে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে গত বুধবার রাত পৌনে ৮টার দিকে নিজের ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন আসিফ নজরুল। তিনি আমেরিকায় বাড়ি কেনা ও পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে গাঁজাখুরি খবর বলে আখ্যা দেন। তিনটি পয়েন্টে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমার বক্তব্য-১. আমি সরকারে থাকা অবস্থায় বা এর আগে-পরে জীবনে কখনো কোনো দুর্নীতি করিনি। এক টাকা—আবার বলি, এক টাকাও দুর্নীতি করিনি। আমার জ্ঞাতসারে কাউকে দুর্নীতি করতেও দিইনি। আমি কোনো নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলিনি, আমার কোনো নতুন সম্পদ হয়নি, আয়কর দেওয়ার সময় আমি কোনো সম্পদ অপ্রদর্শিত রাখিনি। আমি কোনো দুর্নীতি করিনি, করার প্রশ্নই আসে না।
বক্তব্য-২. আমি কোনো স্বজনপ্রীতিও করিনি। সরকারে থাকা অবস্থায় আমার পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনকে বিন্দুমাত্র সুবিধা দিইনি বা তাদের কোনো অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিইনি। আমি প্রায় পাঁচ হাজার আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছি, একজন আত্মীয়কেও নিয়োগ দিইনি। আমার আত্মীয়রা কখনো কারো পক্ষে তদবির করার সুযোগও পাননি। বক্তব্য-৩. আমি কখনো এলাকাপ্রীতি করিনি। উপদেষ্টা থাকাকালে আমার গ্রামের বাড়ি বা ঢাকা শহরে, যেখানে আমি বেড়ে উঠেছি, সেখানে একবারও যাইনি।
তবে আমি লালবাগ শাহী মসজিদের জরুরি উন্নয়নের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে অল্প কিছু আর্থিক সহযোগিতা নিয়মানুগভাবে পেতে সহযোগিতা করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ডাকসুর আবেদনক্রমে ক্রিকেট বোর্ডের কাছে অনুরোধ করে ঢাবির খেলার মাঠের উন্নয়নের জন্য কিছু অনুদান এনে দিয়েছি। এর বাইরে কারো জন্য অনুদানের অনুরোধও আমি কখনো করিনি।’