অন্তর্বর্তী সরকারের আট উপদেষ্টা ও দুই সচিবের বিরুদ্ধে ‘সীমাহীন দুর্নীতি’র প্রমাণ নিজের কাছে রয়েছে, এমন দাবি করে গত বছর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোড়ন তুলেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। উপদেষ্টাদের নাম প্রকাশ না করে তিনি এ অভিযোগ করেছিলেন। যেদিন তিনি এ তথ্য দিয়েছিলেন, সেদিন তিনি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সব ক্ষমতা তার আছে। সে কারণেই দুর্নীতিবাজদের নাম প্রকাশ ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরুর ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে।
এ ব্যাপারে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ বি এম আবদুস সাত্তার গত বছর যখন এ অভিযোগ তুলেছিলেন, তখনই এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ জমা দেওয়া উনার দায়িত্ব ছিল। সেটা না দিয়ে থাকলে এখনই তথ্যপ্রমাণ দুদকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় সরবরাহ করা উচিত।
উনি এখন প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। দায়িত্ব বেড়েছে। প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে। সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে সচিবদের দুর্নীতির ব্যাপারে বলেছিলেন।
ওই বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করতে না পারলে নানান প্রশ্ন উঠবে। এ ব্যাপারে মানুষের জানার অধিকার ও আগ্রহ আছে। দুদকেরও উচিত এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা।’ গত বছরের ৮ আগস্ট রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও আগামী দিনের জনপ্রশাসন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে উপদেষ্টাদের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রমাণ ছাড়া তিনি কোনো কথা বলেন না এবং এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন আছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘উপদেষ্টাদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো নিয়োগ বা বদলি হয় না।
যে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণ হয়েছে, যে উপদেষ্টার পিয়নের অ্যাকাউন্টে ৪০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে, যে উপদেষ্টার এপিএসের অ্যাকাউন্টে ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?’ ওই বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট আট উপদেষ্টার নাম প্রকাশ না করেলেও কয়েকজন উপদেষ্টার কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আবদুস সাত্তার। বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনায় উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় অনভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে পরিচালনা করানো ঠিক হচ্ছে কি না তা ভাবার বিষয়।’ একইভাবে স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন অনভিজ্ঞ উপদেষ্টার হাতে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
দুর্নীতির বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি তখন বলেন, ‘আগামী দিনে যে সরকার আসবে, তাদের জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে আসতে হচ্ছে। তাই হিসাব করে দুর্নীতি করবেন। এতে আপনার পরিবার ও ব্যক্তিজীবন ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকের মতে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের দুর্নীতির পরিমাণ আগের ১৫ বছরের দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর চেয়ে বড় অপবাদ আর কী হতে পারে!’ জুলাই আন্দোলনের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় বসা অন্তত আটজন উপদেষ্টার সীমাহীন দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ দিতে পারবেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ বক্তব্য তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিভিন্ন মহল থেকে ওই আট উপদেষ্টার নাম প্রকাশের দাবি ওঠে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তখন সরকারকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার কথা বলেছিলেন। একই সঙ্গে অভিযোগকারীকে দুর্নীতির দালিলিক প্রমাণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরবর্তীতে বিষয়টির দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
তবে আবদুস সাত্তারের বক্তব্যের পরদিনই সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে তাঁর অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, অজ্ঞাতনামা উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং এ ধরনের অভিযোগের প্রমাণ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ওই ঘটনার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আবদুস সাত্তারের বক্তব্যের দায় সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত এবং এর সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।’
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ’৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা এ বি এম আবদুস সাত্তারকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুগ্ম সচিব থাকাকালে অবসরে পাঠানো হয়। আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে ভূতপূর্ব সচিব পদে পদোন্নতি দেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবদুস সাত্তার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় এসেছে তার সেই বক্তব্য। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, যে আট উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ থাকার দাবি তিনি করেছিলেন, তাদের নাম কি এবার প্রকাশ করা হবে? আর যদি সত্যিই এমন প্রমাণ থাকে, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? এ ব্যাপারে জানতে গত রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন