আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের বিস্তৃতি বাড়তে থাকায় এবং ভারতের তেল-গ্যাস আমদানির বড় অংশ বহনকারী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হুমকির মুখে পড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি বহনকারী জাহাজ নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে ভারত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি এই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে উত্তেজনা নিয়ে কথা বলেছেন, যা জ্বালানি বাণিজ্যকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে তিনবার কথা হয়েছে। সর্বশেষ আলোচনায় জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর বেশি কিছু বলা এখনই সময়োপযোগী নয়।’ তবে এখনো পর্যন্ত ইরান ভারতের অনুরোধ মেনে নিয়েছে এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
একই দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি অঞ্চলটির ‘গুরুতর পরিস্থিতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, বেসামরিক হতাহত ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করেন। মোদি বলেন, আলোচনায় ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও ভারতের উদ্বেগ উঠে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মোদি লেখেন, ‘ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এই অঞ্চলের গুরুতর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।’
মোদি আরও লেখেন, ‘ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পণ্য ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত বজায় রাখা ভারতের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি এবং সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছি।’
এই আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন বিশ্বের মোট তেল-বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, সেটি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের কারণে এবং তার জবাবে তেহরানের উপসাগরীয় পদক্ষেপের ফলে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবরণ অনুযায়ী, তেহরান এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে এবং বলেছে, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে ওয়াশিংটনের ‘আগ্রাসী ও অস্থিতিশীলতামূলক কর্মকাণ্ডের’ কারণে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি, যিনি ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তাঁর বাবা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দায়িত্ব নেন, বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে এই কৌশলগত জলপথ বন্ধই থাকবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা উচিত। তিনি সতর্ক করে দেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে ইরান অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রাখবে এবং প্রয়োজনে নতুন ফ্রন্টও খুলতে পারে।
খামেনির নিজের কণ্ঠে নয়, বরং একজন টেলিভিশন উপস্থাপকের মাধ্যমে এই বক্তব্য প্রচার করা হয়। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডও জানিয়েছে, প্রণালি-সংক্রান্ত তেহরানের অবস্থান কার্যকর করতে তারা প্রস্তুত।
ইরান আগেই সতর্ক করেছিল, কোনো জাহাজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তা হামলার মুখে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতিমধ্যে অঞ্চলে কর্মরত ভারতীয় জাহাজ ও নাবিকদের ওপর পড়েছে। বৃহস্পতিবার আরেক ব্রিফিংয়ে বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশ কুমার সিনহা জানান, পারস্য উপসাগরে একাধিক সামুদ্রিক ঘটনায় তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলোতে থাকা ৭৮ জন ভারতীয় নাবিকের মধ্যে ৭০ জন অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছেন। চারজন আহত হলেও বর্তমানে স্থিতিশীল আছেন।
সিনহা আরও জানান, বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের পতাকাবাহী ২৮টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে ২৪টি জাহাজে ৬৭৭ জন ভারতীয় নাবিক আছেন এবং প্রণালির পূর্বে চারটি জাহাজে ১০১ জন ভারতীয় ক্রু সদস্য রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে থাকা সব ভারতীয় জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে নজরদারি করা হচ্ছে।’
তৃতীয় ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর বিষয়টি ইরাকে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস নিশ্চিত করেছে। তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার ‘সেফসি বিষ্ণু’ ইরাকের বসরার কাছাকাছি পানিতে হামলার শিকার হয়। জাহাজে থাকা বাকি ১৫ জন ভারতীয় ক্রুকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে জড়িত। ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন উৎপাদক দেশ থেকে ভারতের আমদানি করা অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল এই সরু জলপথ পেরিয়ে আরব সাগরে পৌঁছায়। ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে সরকার বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
ভারত এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলার সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। তবে জাহাজ চলাচল এবং প্রবাসী ভারতীয়দের সুরক্ষায় আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।