সব ধমের্র মানুষকে নিয়ে একটি শান্তির বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আমরা আজ সব ধমের্র মানুষ একসঙ্গে বসেছি, এক কাতারে বসেছি। এটি আমাদের বাংলাদেশের আবহমানকালের ঐতিহ্য। কেউ যেন আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে।
শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, মন্দিরের পুরোহিত, সেবায়েত এবং বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষদের মাসিক সম্মানী প্রদান পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান– আমরা সবাই মিলে একটি শান্তিময় ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলব। সকলের জন্য আমরা গড়ে তুলব একটি নিরাপদ রাষ্ট্র; একটি নিরাপদ সমাজ। আমরা সারাদেশে মসজিদ এবং এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই।
তিনি বলেন, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, অধ্যক্ষদের সম্মানী ভাতা দেওয়ার কর্মসূচি বর্তমান সরকার চালু করেছে। আজ (শনিবার) থেকে এ কর্মসূচির অধীনে প্রথম পর্যায়ে পাইলটিং স্কিমের আওতায় ৪৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারে ১৬ হাজার ৯৯২ জন এই মাসিক সম্মানী পাওয়া শুরু করেছেন। পর্যায়ক্রমে সবাইকে এ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সরকারের এসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নাগরিকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।
তারেক রহমান আরও বলেন, আপনাদের কাছে একটি বিনীত আহ্বান, আপনারা কেউ মসজিদে কিংবা যার যার ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব কল্যাণের পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে চাইলে আপনাদের সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে সহযোগিতা করা। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিটি জেলা-উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে একজন ইমাম অথবা একজন খতিব অথবা সেই এলাকার অন্য কোনো ধর্মীয় গুরু, তাদেরও সদস্য হিসেবে রাখব।
ভোটের কালি শুকানোর আগেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যারা অর্থনৈতিকভাবে হয়তো বা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে, তাদের জন্য একটি সম্মানী বা আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য দূর করে আমরা সবাই মিলে একটু শান্তিতে, একটু ভালোভাবে থাকব। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে সেই রকমই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মোচনের আগেই আমরা আমাদের সকল প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছি। পর্যায়ক্রমে এই কার্ড সারা বাংলাদেশে ৪ কোটি পরিবারের নারীপ্রধান পাবেন। আগামী ১৪ এপ্রিল তথা পহেলা বৈশাখ থেকে আমরা কৃষক কার্ডের পাইলট প্রকল্প চালু করব। আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের খাল খনন কর্মসূচি।
নাগরিকদের দুর্বল করলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না
তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ কিংবা তাদের তাঁবেদার অপশক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে; কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। আজ এই মঞ্চ থেকেও এ রকম একটি কথা বলা হয়েছে– যারা ধর্মীয় গুরু আপনারা আছেন, প্রতিটি ধর্মের তারা স্বাধীনভাবে যাতে কথা বলতে পারেন, সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের যদি দুর্বল করে রাখা হয় তাহলে রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। সে জন্যই আমাদের ইচ্ছা, আমাদের দর্শন, আমাদের পরিকল্পনা, বাংলাদেশের নাগরিকদের আমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ধীরে ধীরে শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলতে চাই, যদি আমরা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে চাই।
নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকে আপনারা আপনাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতাকে কীভাবে আরও বেশি করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে প্রয়োগ করতে পারেন, সেই চিন্তা এবং চেষ্টাও অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র মানুষের জীবনে হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে। কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতাবোধ, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, সংহতি, সহনশীলতা, উদারতা, বন্ধুত্ব, বিনয়, দায় কিংবা দয়া- এই বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন ছাড়া একজন ব্যক্তি মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না।
এই পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি মসজিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ থেকে ইমাম ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন ৩ হাজার টাকা এবং খাদেম ২ হাজার টাকা পাবেন। এ ছাড়া মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার জন্য মাসিক ৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি (পুরোহিত/অধ্যক্ষ/যাজক) পাবেন ৫ হাজার টাকা এবং সহকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তি (সেবায়েত/উপাধ্যক্ষ/সহকারী পালক) পাবেন ৩ হাজার টাকা।
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ অনুষ্ঠানে সম্মানীর পাশাপাশি উৎসব বোনাস প্রদানের ঘোষণাও দেন। তিনি জানান, মসজিদে কর্মরতদের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ১ হাজার টাকা করে বছরে দুবার বোনাস দেওয়া হবে। দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা বা বড়দিনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতারা ২ হাজার টাকা করে বোনাস পাবেন। তবে যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সরকারের কাছ থেকে কিংবা বিদেশি সংস্থা থেকে নিয়মিত অনুদান পায়, সেসব আপাতত এ সুবিধার বাইরে থাকবে।
ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইনের (কায়কোবাদ) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম, বায়তুল মোকাররম মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মহিববুল্লাহিল বাকী, তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, ধর্ম সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদসহ কয়েকজন ধর্মগুরু বক্তব্য রাখেন।