যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করতে যাচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তিনি বলেছেন, নতুন এই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রয়োজন কমে আসতে পারে। নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত আগামী সোমবার প্রকাশ করা হবে।
বৃহস্পতিবার সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল হবে দ্বিমুখী-একদিকে নৌ অবরোধ, অন্যদিকে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। তার দাবি, এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীকে চাপে ফেলা সম্ভব হবে।
এর এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, যেকোনো দেশ যদি তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়, তাহলে সেই দেশকেও গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।
স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সেদিন স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হবে।
বেসেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে ইরানের ওপর আরোপ করা মার্কিন নৌ অবরোধ-যা জুনের মাঝামাঝি এক মাসের জন্য স্থগিত ছিল এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা একসঙ্গে প্রয়োগ করা হবে। তার মতে, এই সমন্বিত অর্থনৈতিক চাপই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশল।
ইরানের তেল রপ্তানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
চীনকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট সরাসরি কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেন, এ ধরনের অনেক আলোচনা প্রকাশ্যে নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে হওয়াই ভালো। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, চীনের প্রায় অর্ধেক জ্বালানি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। তাই হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা চীনেরও স্বার্থে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস বলেছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান করে না। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকটের সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়েছে। তেহরান এসব পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, এ ধরনের চাপ ইরানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্পে কোনো ধরনের দ্বিধা সৃষ্টি করতে পারবে না।
ইরান প্রায় পাঁচ দশক ধরে, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই বিভিন্ন মাত্রার মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। নতুন ঘোষিত প্যাকেজটি আগের সব পদক্ষেপের চেয়ে কঠোর হবে বলেই দাবি করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। এ যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও এতে জড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে, কারণ ইরান একাধিকবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো।
সংঘাত নিরসনে এপ্রিল ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও কোনোটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উভয় চুক্তির লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা এবং যুদ্ধ অবসানের পথ তৈরি করা। কিন্তু দুই দফার যুদ্ধবিরতিই দ্রুত ভেঙে পড়ে।
মার্কিন হুমকির পর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও তেল পরিবহনকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্প প্রশাসন চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য জনমত ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, আর নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট-বিশেষ করে রেকর্ড ঋণ ও উচ্চ সুদের হার- থেকে জনমতের দৃষ্টি সরাতেই এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, ওয়াশিংটনের একই ধরনের নীতির ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত আরও ব্যর্থতারই জন্ম দেবে।