August 25, 2026, 5:01 am

এবার সাভারে ওরস বন্ধের দাবি ‘তৌহিদি জনতার’, নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, August 25, 2026
  • 35 Time View

এবার সাভারে সুরেশ্বর পীরের অনুসারী কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীরের বাড়িতে আগামী ২৬-২৭ আগস্ট আয়োজিত ওরস বন্ধের দাবিতে উপজেলা প্রশাসন ও থানায় বিক্ষোভ করা হয়েছে। ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে এ কর্মসূচির নেতৃত্ব ও দাবি তুলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেতারা।

ওরসে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দেওয়া হয়- এমন অভিযোগ তুলে উপজেলা প্রশাসন, সাভার থানাসহ কয়েকটি দফতরে স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা। স্মারকলিপিতে ‘তৌহিদি জনতার’ পক্ষে ১০ জন ব্যক্তি ওরস বন্ধের দাবি জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন।

ওই ১০ ব্যক্তির মধ্যে- তিন জন হেফাজতে ইসলামের নেতা, দুজন বিএনপির নেতা, একজন যুবদলের নেতা, একজন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতা, একজন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা, একজন জামায়াতে ইসলামীর কর্মী এবং একজন এলাকার পীর (ধর্মীয় নেতা) রয়েছেন। রবিবার (২৩ আগস্ট) এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সাভার মডেল থানায় লিখিত স্মারকলিপি দেন তারা।

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন চাকুলিয়ার পীর সাহেব মাওলানা তৈয়বুর রহমান খান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হাক্কানী, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার আমির মাওলানা আলী আকবর কাসেমী, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার মহাসচিব মাওলানা আলী আজম সাহেব, হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আমিনুল ইসলাম কাসেমী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সাভার থানা শাখার সভাপতি মাওলানা আলী আশরাফ তৈয়ব, সাভার থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহা. আবুল খায়ের বেপারী, সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল, জামায়াতের কর্মী আমিনুল ইসলাম আমিন এবং সাভার থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক (বর্তমান সেক্রেটারি প্রার্থী) মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লা।

তাদের অভিযোগ

স্মারকলিপিতে বলা হয়, জাবের আল জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে আল্লাহ, রাসুল ও পীরের মধ্যে পার্থক্য নেই- এমন বক্তব্যসহ নামাজ-রোজা, জান্নাত-জাহান্নাম ও কেয়ামত নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। এ অবস্থায় আগামী ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট জাবের আল জাহাঙ্গীরের বাড়িতে অনুষ্ঠেয় ওরস বন্ধ এবং ‘তৌহিদি জনতার’ বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

যা বললেন কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীর

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাজী জাবের আল জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আমার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় আমার পরিবারের সদস্যসহ অনেকে আহত হন এবং বাড়িঘর ও যানবাহনে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এ ঘটনায় আগে স্থানীয় কয়েকজনের করা মামলার পর আমরাও পাল্টা মামলা করেছি।’

জাবের আল জাহাঙ্গীর জানান, তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিষয়ে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তা মিথ্যা। তিনি কারও সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্কে জড়াতে চান না। কারও আপত্তি থাকলে কোরআন-হাদিসের দলিল নিয়ে প্রশাসনের উপস্থিতিতে আলোচনায় বসতে তিনি প্রস্তুত।

তিনি জানান, তাদের বাড়িতে তার বাবার ওফাত উপলক্ষে প্রায় ১৯ বছর ধরে ঘরোয়াভাবে ওরস হয়ে আসছে। এবারও বাড়ির সীমানার ভেতরেই অনুষ্ঠান করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বাইরে কোনও প্যান্ডেল বা মাইক ব্যবহার করা হবে না। তবে ওরসকে কেন্দ্র করে তার বাড়িতে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি জানিয়েছেন।

তৌহিদি জনতার পক্ষে নেতাদের বক্তব্য

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হাক্কানী বলেন, ‘তার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কোনও শত্রুতা নেই। এমনকি পৃথিবীর কোনও মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু ইসলামের নামে তিনি অপব্যাখ্যা করছেন এবং কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। বিশেষ করে তার কথাবার্তায় যেসব বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে কোরআন ও হাদিসের মারাত্মক সংঘর্ষ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন অপব্যাখ্যামূলক বক্তব্য দিয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন এবং এলাকায় ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যে গত বছর এ বিষয়কে কেন্দ্র করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। এখন আমরা তার কিছু কার্যকলাপ নিয়ে গত কয়েকদিন বৈঠক করেছি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেহেতু দেশে আইন রয়েছে, তাই আইনের মাধ্যমেই সরকার হস্তক্ষেপ করে এসব কার্যক্রম বন্ধ করবে।’

জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলাম ঢাকা জেলা উত্তর শাখার মহাসচিব মাওলানা আলী আজম বলেন, ‘আসলে ওই এলাকা আমাদের কাছাকাছি। সেখানকার মুসল্লি ও আলেম-ওলামা মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা জানান, এর আগে সেখানে ঝামেলা হয়েছিল এবং ওরসের সময় কখনও কখনও নবীই আল্লাহ, আল্লাহই নবী-এ ধরনের কোরআন-হাদিসবিরোধী কথা বলা হয়। এ কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তৌহিদি জনতা ও আলেম-ওলামারা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, বিষয়টি যদি ইসলামের আকিদাবিরোধী হয়, তাহলে আমাদের সবারই এ বিষয়ে কথা বলা এবং দাবি জানানো উচিত। মূলত এ কারণেই আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি।’

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারী আমিনুল ইসলাম আমিন নিজেকে জামায়াতের কর্মী দাবি করে বলেন, ‘এলাকার গণ্যমান্য আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের অভিযোগ, জাবের আল জাহাঙ্গীর নামে এক পীর ফেসবুক ও ইউটিউবে ইসলামবিরোধী ও আপত্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সাভার থানা কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী আশরাফ তৈয়ব বলেন, ‘ওরস বন্ধ করা আমাদের উদ্দেশ্য না। তার (জাবের আল-জাহাঙ্গীর) যত অনৈসলামিক কার্যকলাপ আছে, সেগুলো বন্ধ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’

সাভার থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি সাইদুল ইবনে হাসিব সোহেল বলেন, ‘এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এক পক্ষ সেখানে ওরস হোক চাচ্ছে, আরেক পক্ষ চাচ্ছে না। ভিন্নমত তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে।’

সাভার থানা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক (বর্তমান সেক্রেটারি প্রার্থী) মোহাম্মদ মঞ্জু মোল্লা বলেন, ‘আমরা ওরস বন্ধ করতে চাই না। ওখানে ইসলামবিদ্বেষী কথা হয়, আমরা সেটাই বন্ধ চাইছি। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা তৌহিদি জনতার পক্ষে রয়েছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছি।’

তৎপর প্রশাসন

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যারা অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, তাদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল আলম বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে। কোনও ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে পুলিশ।’

আগেও হামলার শিকার হয়েছিল কাজী জাবেরের বাড়ি

২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর চাকুলিয়া এলাকায় শাহ্ সুফি সৈয়দ মাওলানা কাজী আফসার উদ্দিন আল জাহাঙ্গীর আল সুরেশ্বরীর মাজার ও তার ছেলে সুফি সাধক কাজী জাবেরের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৪ অক্টোবর কাজী জাবেরের ভাই কাজী গোলাম রসুল সাভার মডেল থানায় মামলা করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তৌহিদি জনতার নামে প্রায় ৫০০ জন লাঠিসোঁটা, রামদা, কুঠার, লোহার পাইপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাদীর বাড়িতে হামলা করে। তারা বাড়িটিকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে বাড়ির আসবাবপত্র, জানালার কাঁচসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রের ক্ষয়ক্ষতি হয়। অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয় দুটি মোটরসাইকেল। এছাড়া প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ওই বাড়িতে থাকা মাওলানা আফসার উদ্দিনের মাজারে ভাঙচুরের চেষ্টা করে। খবর পেয়ে রাত ১২টার দিকে সেনাবাহিনী ও সাভার মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ হামলায় ২০ থেকে ২৫ জন আহত হন। ওই হামলার ঘটনার পর তৌহিদি জনতার পক্ষে এবারও ওরস বন্ধের দাবি তোলা হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © dainikkhobor.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com