বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই কেবল একটি ট্রফির লড়াই নয়, বরং ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে ফেলার সুযোগ। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রোববার (১৯ জুলাই) দিবাগত রাত ১টায় আর্জেন্টিনা ও স্পেনের লড়াইটি সেই সম্ভাবনায় ঠাসা। একদিকে টানা দুইবার শিরোপার হাতছানি আর্জেন্টিনার সামনে, অন্যদিকে অপরাজেয় বিশ্বরেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে স্পেন। দুই দলের ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জনের খতিয়ান টানলে দেখা যাচ্ছে, এই ফাইনাল হতে যাচ্ছে রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এক মহাকাব্য।
৬৪ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা: আর্জেন্টিনা শিরোপা ধরে রাখতে পারলে ইতালি (১৯৩৪-৩৮) ও ব্রাজিলের (১৯৫৮-৬২) পর তৃতীয় দেশ হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়বে। এছাড়া চতুর্থ শিরোপা জিতে জার্মানি ও ইতালির পাশে বসবে আলবিসেলেস্তেরা। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলই শুধু থাকবে সামনে।
স্কালোনির সামনে পোজ্জোর পাশে বসার সুযোগ: বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুবার শিরোপা জেতা একমাত্র কোচ ইতালির ভিত্তোরিও পোজ্জো। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে তার অধীনেই বিশ্বকাপ জিতেছিল ইতালি। স্পেনকে হারাতে পারলে দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জিতবেন স্কালোনি। একই কোচের অধীনে টানা দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘটনাও ঘটবে ৮৮ বছর পর। ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে শিরোপা ধরে রাখলেও দুই আসরে তাদের কোচ ছিলেন আলাদা।
দুই বিশ্বকাপজয়ী প্রথম অধিনায়ক হবেন মেসি: বিশ্বকাপের ট্রফি দুবার তুলে ধরা প্রথম অধিনায়ক হওয়ার সুযোগ মেসির সামনে। ইতালি ও ব্রাজিল টানা বিশ্বকাপ জিতলেও দুটি আসরে তাদের অধিনায়ক ছিলেন আলাদা। মেসি এরই মধ্যে অধিনায়ক হিসেবে দলকে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলেছেন। ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে হারের পর ২০২২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে পেয়েছিলেন আরাধ্য ট্রফি। এবার জিতলে অধিনায়কত্বের ইতিহাসে একক উচ্চতায় উঠবেন তিনি। ফাইনালে মাঠে নামলে কাফুর পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার কীর্তিও গড়বেন মেসি। একাদশে থাকলে তিনটি ফাইনাল শুরু করা প্রথম খেলোয়াড় হবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ফাইনালে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড়: ফাইনালের দিন মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর ২৫ দিন। মাঠে নামলেই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সি আউটফিল্ড খেলোয়াড় হবেন তিনি। ভেঙে দেবেন ১৯৫৮ সালের ফাইনাল খেলা সুইডেনের গুনার গ্রেনের ৩৭ বছর ২৪১ দিনের রেকর্ড। সব অবস্থান মিলিয়ে মেসির সামনে থাকবেন শুধু ইতালির গোলকিপার দিনো জফ। ১৯৮২ সালের ফাইনাল খেলার সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর ১৩৩ দিন। এটি হবে মেসির ৩৪তম বিশ্বকাপ ম্যাচ। নিজের দখলে থাকা সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিকে আরও বড় করবেন তিনি।
গোল করলেই আরেকটি ইতিহাস গড়বেন মেসি: স্পেনের বিপক্ষে গোল করতে পারলে বিশ্বকাপ ফাইনালের সবচেয়ে বেশি বয়সি গোলদাতা হবেন মেসি। রেকর্ডটি এখন সুইডেনের নিলস লিডহোমের। ১৯৫৮ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করার সময় তার বয়স ছিল ৩৫ বছর ২৬৪ দিন। মেসি এরই মধ্যে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের মালিক। ফাইনালে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট পেলে নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ হবে।
এক আসরে আট জয়: এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সাত ম্যাচের সব কটিই জিতেছে আর্জেন্টিনা। ফাইনাল নির্ধারিত বা অতিরিক্ত সময়ে জিতলে বিশ্বকাপের এক আসরে আটটি আনুষ্ঠানিক জয় পাওয়া প্রথম দল হবে তারা। বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হওয়ায় এবারই প্রথম কোনো দল আটটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ফাইনাল টাইব্রেকারে জিতলে অবশ্য পরিসংখ্যানে ম্যাচটি ড্র হিসেবে গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে আট জয়ের রেকর্ডটি হবে না।
স্পেনের সামনে অপরাজেয়তার বিশ্বরেকর্ড: স্পেন টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ফাইনালে উঠেছে। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতালির ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড এখন তারা ছুঁয়ে আছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নির্ধারিত বা অতিরিক্ত সময় শেষে হার এড়াতে পারলেই টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে এককভাবে রেকর্ডের মালিক হবে স্পেন। টাইব্রেকারে হারলেও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে ম্যাচটি ড্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাদের অপরাজিত যাত্রা অক্ষুণ্ন থাকবে। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার কাছে হারের পর আর কোনো ম্যাচ হারেনি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
রক্ষণে নতুন মানদণ্ডের সামনে স্পেন: সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল খেয়েছে স্পেন। উনাই সিমন ক্লিন শিট রেখেছেন ছয় ম্যাচে, যা বিশ্বকাপের এক আসরে কোনো গোলকিপারের সর্বোচ্চ। ফাইনালেও গোল না খেলে সংখ্যাটি সাত হবে। স্পেন চ্যাম্পিয়নও হলে মাত্র একটি গোল হজম করে বিশ্বকাপ জয়ের নতুন রেকর্ড গড়বে। এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন দলের সবচেয়ে কম গোল হজমের রেকর্ড দুইটি। ফ্রান্স ১৯৯৮, ইতালি ২০০৬ এবং স্পেন ২০১০ সালে দুই গোল করে হজম করেছিল।
সবচেয়ে বেশি বয়সী বিশ্বকাপজয়ী কোচ: স্পেন চ্যাম্পিয়ন হলে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ জেতা কোচ হবেন দে লা ফুয়েন্তে। ফাইনালের দিন তার বয়স হবে ৬৫ বছর ২৮ দিন। বর্তমান রেকর্ডটিও একজন স্প্যানিশ কোচের। ২০১০ সালে ৫৯ বছর ২০০ দিন বয়সে স্পেনকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ভিসেন্তে দেল বস্কে।
ইয়ামাল ও কুবারসির কিশোর রেকর্ড: ফাইনালের দিন ইয়ামালের বয়স হবে ১৯ বছর ৬ দিন। মাঠে নামলে পেলে ও জিউসেপ্পে বের্গোমির পর বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হবেন তিনি। পেছনে ফেলবেন ২০১৮ সালের ফাইনাল খেলা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে। গোল করতে পারলে পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ ফাইনাল গোলদাতা হবেন ইয়ামাল। সে ক্ষেত্রেও ভাঙবে এমবাপ্পের রেকর্ড। ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি দুজনই কিশোর বয়সে সাতটি করে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে এমবাপ্পের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। ফাইনালে খেললে আট ম্যাচ নিয়ে যৌথভাবে নতুন রেকর্ড গড়বেন স্পেনের দুই তরুণ।
মেসি ও ইয়ামালের ২০ বছরের ব্যবধান: মেসি ও ইয়ামাল দুজনই একাদশে থাকলে বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ দলের দুই খেলোয়াড়ের বয়সের ব্যবধানেও রেকর্ড হবে। দুজনের মধ্যে পার্থক্য ২০ বছর ১৯ দিন। ফাইনালের দুই দলের শুরুর একাদশে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে এর আগে কখনো ২০ বছরের বেশি ব্যবধান দেখা যায়নি।
ওইয়ারসাবালের সামনে মাইলফলক: পাঁচ গোল করে বিশ্বকাপের এক আসরে স্পেনের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডে এমিলিও বুত্রাগেনিও ও দাভিদ ভিয়ার পাশে বসেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল। । ফাইনালে আরেকটি গোল করলেই রেকর্ডটি একার হবে তার।
দুই দলের এই লড়াইয়ে একদিকে যেমন অভিজ্ঞতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখা যাবে মেসির মধ্যে, অন্যদিকে ইয়ামালদের তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন, রোববার রাতে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি ইতিহাসের পাতাতেও নতুন রঙ লাগবে। আর্জেন্টিনা কি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখবে, নাকি স্পেন তাদের অপরাজেয় যাত্রাকে শিরোপার মুকুটে রূপ দেবে?