ধর্ম ডেস্ক: ইসলাম ধর্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মক্কা যুগের তুলনায় মদিনা হিজরতের পর মুসলিম সমাজে এক ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মক্কায় প্রকাশ্য শত্রুতার মুখোমুখি হতে হলেও মদিনায় এমন কিছু মানুষের উদ্ভব ঘটেছিল যারা মুখে বিশ্বাসের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে কপটতা ও শত্রুতা পোষণ করত। মরুভূমির এক চঞ্চল প্রাণী জারবোয়া যেভাবে বিপদে পালানোর জন্য মূল পথের পাশাপাশি একটি গোপন পথ বা নাফিকা তৈরি করত, ঠিক তেমনি মোনাফেকরাও দ্বিমুখী আচরণের মাধ্যমে সমাজে প্রতারণার আশ্রয় নেয়। ইসলামী পরিভাষায় এই ধরনের মানসিকতা ও আচরণকেই নিফাক বা মোনাফেকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মোনাফেক ব্যক্তিরা সবসময় এক ধরণের তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব ও অশান্তির মধ্যে দিন কাটায়। তারা নিজেদের সমাজে খাঁটি মুসলিম হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করলেও তাদের অন্তর থাকে সমাজের মূল আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে এই অবস্থাকে একটি অন্তহীন মানসিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সময়ের সাথে সাথে ক্যান্সারের মতো পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরকালের হিসাব-নিকাশের সময়ও এই কপট ব্যক্তিরা মুমিনদের সান্নিধ্য ও আলোর সামান্য সুবিধা পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করবে, কিন্তু তাদের বিগত জীবনের দ্বিমুখী আচরণ ও ষড়যন্ত্রের কারণে তারা বঞ্চিত হবে।
ইসলামী পন্ডিত ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী মোনাফেকদের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো তাদের ভেতরের ও বাইরের রূপের সম্পূর্ণ অমিল। তারা মুখে যা বলে অন্তরে তা বিশ্বাস করে না এবং সুযোগ পেলেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আমানতের খেয়ানত করে থাকে। মক্কার প্রকাশ্য শত্রুদের মোকাবিলা করা যতটা সহজ ছিল, মদিনার এই ঘাপটি মেরে থাকা মোনাফেকদের চিহ্নিত করা ততটাই কঠিন ছিল। পরবর্তী সময়ে সাহাবিদের অনেকেই এই দ্বিমুখী চরিত্রের তীব্র সমালোচনা করে সতর্ক করেছিলেন, কারণ এই ধরনের মানুষরা সমাজের ভেতর ঘুণপোকার মতো বিশ্বাস ও সংহতি নষ্ট করে।
সত্যের পথে চলার ক্ষেত্রে মোনাফেকরা সবসময় চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সংশয়ের শিকার হয়। তারা পুরোপুরি সত্যকে যেমন গ্রহণ করতে পারে না, তেমনি পুরোপুরি বর্জনও করতে পারে না, বরং সুবিধাবাদী মনোভাব নিয়ে দুই দলের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। ইসলামী ইতিহাস ও জীবনদর্শনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিথ্যাচার এবং লোকদেখানো স্বভাবের মতো নেতিবাচক অভ্যাসগুলোই মূলত এই কপটতার বীজ রোপণ করে। আধুনিক যুগে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে এই দ্বিমুখী আচরণ নতুন রূপ ধারণ করেছে, যা মানুষের সহজাত মানবিক গুণাবলি ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।