আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরান যুদ্ধ নিয়ে আগে থেকেই মার্কিন জনগণের মধ্যে যে অনাগ্রহ ছিল, তা ক্রমশ আরও জটিল হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার (৪ এপ্রিল) ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।
এ ঘটনায় এখনো অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে, বিশেষ করে বিমানের দুই ক্রু সদস্যের অবস্থা নিয়ে। সিএনএন জানিয়েছে, তাদের একজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তবে অন্যজনের ভাগ্য এখনো নিশ্চিত নয়। এরপর শুক্রবার আরও একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানে হামলার খবর আসে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, পাইলট বিমানটি ইরানের আকাশসীমার বাইরে নিয়ে গিয়ে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন এবং পরে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এই দুটি ঘটনায় ইরান হঠাৎ করে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে গেছে—এমনটা ইঙ্গিত দিচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি সীমিত, গত তিন সপ্তাহে কোনো মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়নি। কিন্তু যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সামরিক আধিপত্য, সেখানে এই ঘটনাগুলো অসম যুদ্ধের ঝুঁকি ও বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে—যার মূল্য দিতে আগ্রহী নয় মার্কিন জনগণ।
এই ঘটনাগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের আকাশসীমায় ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ থাকার দাবিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গত এক মাস ধরে যে মার্কিন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যে চিত্র তুলে ধরেছিল, তাতেও ফাটল ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের আকাশে প্রায় বাধাহীনভাবে অভিযান চালাতে পারে। তারা ইরানকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যেন প্রতিরোধের কোনো সক্ষমতাই নেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের।
গত ৪ মার্চের এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ বলেছিলেন, খুব দ্রুতই ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই বিমান বাহিনী (ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র) ইরানের আকাশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেবে এবং সেটি হবে ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’। ট্রাম্পও গত কয়েক সপ্তাহে একই দাবি জোর দিয়ে তুলে ধরেন। গত ২৪ মার্চ তিনি বলেন, ‘আমাদের বিমান তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে উড়ছে, তারা (ইরান) কিছুই করতে পারছে না।’ এমনকি তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রেও হামলা চালাতে পারে এবং ইরান তা ঠেকাতে পারবে না।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের কোনো নৌবাহিনী নেই, কোনো সেনাবাহিনী নেই’, কোনো বিমান বাহিনী নেই এবং কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। হোয়াইট হাউসে এক ভাষণে তিনি বলেন, ইরানের রাডার ব্যবস্থা ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে’ এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি’।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার বিমানের মধ্যে মাত্র দুটি ভূপাতিত হয়েছে—এটি বড় পরাজয় নয়। ট্রাম্প প্রশাসন আগেই স্বীকার করেছিল, কিছু ক্ষয়ক্ষতি বা ব্যর্থতা আসতেই পারে।
কিন্তু ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ এমন চূড়ান্ত দাবি এখন প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে, ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই—এমন বক্তব্যও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
এটি ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক সাফল্য নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবির আরেকটি উদাহরণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত বছরের জুনে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সেই দাবি পুরোপুরি সমর্থন পায়নি। মাত্র নয় মাস পরই আবার ইরানকে তাৎক্ষণিক পারমাণবিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এছাড়া, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার জন্য ট্রাম্প ইরানকে দায়ী করেছিলেন। পরে প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হামলাটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই হয়েছিল।
সম্প্রতি সিএনএন আরও জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার ধ্বংস নিয়ে ট্রাম্পের দাবিও অনেকটা ‘অতিরঞ্জিত’ ছিল। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখনো তাদের প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ছে। কারণ তাদের প্রধান শক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছিল সামরিক সাফল্যই। কিন্তু গতকালের ঘটনার পর সেই সাফল্য ‘প্রশ্নবিদ্ধ’।
কিন্তু মার্কিন জনগণের বড় একটি অংশ এই যুদ্ধে আস্থা রাখতে পারছে না। তারা মনে করছে, যুদ্ধের লক্ষ্য স্পষ্ট নয় এবং তা বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ—হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে, সাধারণ আমেরিকানদের কাছে এই যুদ্ধের খরচ ও লক্ষ্য সার্থক বলে মনে হচ্ছে না বলে জানায় সিএনএন।