অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে। তবে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ আক্রান্ত হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। এই নিরাপত্তা সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ৩৫ লাখ প্রবাসী কর্মী এবং দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীরা নানামুখী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বর্তমান এই সংকট যদি দ্রুত নিরসন না হয়, তবে একদিকে যেমন নতুন কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে, অন্যদিকে সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে, যার বড় অংশজুড়ে রয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসিভুক্ত দেশগুলো। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে যে পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে, তার একটি বিরাট অংশ এককভাবে অর্জিত হয়েছে শুধু সৌদি আরব থেকেই। বিগত বছরের তুলনায় এই দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও চলমান নিরাপত্তা সংকট সেই অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎসটি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকেও নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং অর্থনীতিবিদেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অর্থনীতির বর্তমান ইতিবাচক সূচকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা পুরো অর্থনীতিকেই নাড়া দেবে। এই পরিস্থিতি এড়াতে সরকারকে এখনই কূটনৈতিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের নতুন নতুন গন্তব্য বা বিকল্প উৎস খোঁজার ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো উৎসাহিত করতে বর্তমানে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার পাশাপাশি প্রবাসী কার্ড চালুর মতো পরীক্ষামূলক উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে শুধুমাত্র আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি করে প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা এবং প্রথাগত বাজারের বাইরে নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করা এখন সময়ের দাবি।