প্রযুক্তি ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনে এক সেকেন্ডের গুরুত্ব হয়তো খুব একটা উপলব্ধি করা যায় না, কিন্তু বৈশ্বিক সময় পরিমাপে এই ছোট্ট একটি মুহূর্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পারমাণবিক ঘড়ির নিখুঁত সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর নিজস্ব মহাজাগতিক গতির তাল মেলাতে ১৯৭২ সাল থেকে বৈশ্বিক সময়সূচিতে অতিরিক্ত এক সেকেন্ড বা লিপ সেকেন্ড যোগ করার নিয়ম চালু করা হয়েছিল। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এই ঐতিহ্যবাহী প্রথা চিরতরে বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের মে মাসের পর থেকে ঘড়ির কাঁটায় আর কোনো নতুন লিপ সেকেন্ড যোগ করা হবে না।
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে চাঁদ ও পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ নানা কারণে অতীতে পৃথিবীর আবর্তনের গতি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছিল। এই গতির তারতম্য সামাল দিতেই মূলত পারমাণবিক সময়ের সঙ্গে মিল রেখে ঘড়িতে অতিরিক্ত সেকেন্ড যুক্ত করতে হতো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে এক অভিনব পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পৃথিবী এখন ধীরগতির বদলে উল্টো আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ঘুরতে শুরু করেছে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, অদূর ভবিষ্যতে ঘড়িতে অতিরিক্ত সেকেন্ড যোগ করার পরিবর্তে উল্টো এক সেকেন্ড বিয়োগ করার অর্থাৎ নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড প্রয়োগ করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
ঘড়ির কাঁটা থেকে হুট করে এক সেকেন্ড বাদ দেওয়ার এই ধারণটি বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। অতীতে সামান্য এক সেকেন্ড যোগ করার কারণেও বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের সার্ভার জটিলতা ও বিঘ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ ধরনের নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড যদি সত্যিই প্রয়োগ করা হতো, তবে তা বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা, বৈশ্বিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং ব্যাংকিং খাতের ডিজিটাল অবকাঠামোয় এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। সম্ভাব্য সেই বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত ধস এড়াতেই বিশেষজ্ঞরা এই বিপজ্জনক পথে না হেঁটে বরং পুরো লিপ সেকেন্ড প্রথাটিকেই স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েটস অ্যান্ড মেজারমেন্টসের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই যুগান্তকারী পরিবর্তন কার্যকর করা হবে। প্রথাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পারমাণবিক ঘড়ি এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন সময়ের মধ্যে ভবিষ্যতে যে সামান্য পার্থক্য তৈরি হবে, তা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ের ব্যবধান জমতে জমতে কয়েক হাজার বছর সময় লেগে যাবে, এবং তখন হয়তো ভবিষ্যতের মানুষ কোনো এক সময়ে একটি আস্ত ঘণ্টা বা লিপ আওয়ার যুক্ত করার কথা বিবেচনা করবে। এর ফলে বর্তমান যুগের প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সময়ের হিসাবে বড় ধরনের গোলমেলে বিপত্তি থেকে চিরতরে মুক্তি মিলল।