সিলেটের জামাই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামে। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক বাড়ি। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই বাড়িটি আলোচিত। বংশপরম্পরায় এ পরিবারে জন্ম নিয়েছেন বহু গুণীজন, যা আজও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। প্রায় ১১০ বিঘা জমির ওপর বিশাল এই বাড়ির ভেতরে রয়েছে প্রাচীন দিঘি ‘আবিদ সাগর’। পরিবারের পূর্বপুরুষ আবিদ আলী খানের নামানুসারেই দিঘিটির নামকরণ। এটি বহু পুরোনো এবং এলাকাজুড়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে পরিচিত। এই জমির ওপর ১৯৩৩ সালে আসাম প্যাটার্নের দৃষ্টিনন্দন বাড়িটি নির্মাণ করা হয়।
এই পরিবারের পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন খান বাহাদুর ডা. আসাদ্দর আলী খান তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিভিল সার্জন ছিলেন। গজনফর আলী খান ছিলেন সিআইই, আইসিএস ও ওবিই খেতাবপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আমলের আইসিএস কর্মকর্তা। পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, এই বংশের একজন পূর্বসূরি ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম রানি এলিজাবেথের চিকিৎসক।
এই পরিবারের সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বিচারপতি ব্যারিস্টার আহমদ আলী খান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আইরিন খান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের চাচাতো বোন।
এই বিশাল বাড়ি ও ভূমিসম্পদ সিলেটে থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় উত্তরাধিকারীদের অধিকাংশই বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তবে জামাই তারেক রহমানের আগমনের খবরে অনেকেই দেশে ফিরে এসেছেন। তার আগমন উপলক্ষ্যে গত কয়েকদিন ধরে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক বাড়ির পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাড়ির ভেতরে ও আশপাশে তৈরি করা হয়েছে পার্কিং ব্যবস্থা, নতুন গেটসহ নানা অবকাঠামো। মঙ্গলবার রাতেও কয়েকশ মানুষ প্রস্তুতি পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন।
জামাই ও অতিথিদের আপ্যায়নে বুধবার দুপুর থেকেই শুরু হয় রান্নাবান্না। প্রায় ৪০টি ডেকচিতে তেহারি রান্না করেন বাবুর্চিরা। পুরো আয়োজন তদারকি করেন ডা. জোবাইদা রহমানের চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীর আলী খান।
তিনি জানান, বিদেশে অবস্থানকালেও তারেক রহমানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। তবে দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সম্পর্কের ছবি প্রকাশ করা হয়নি।
ডা. জোবাইদা রহমানের বাবা প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান সর্বমহলে পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি নৌবাহিনীপ্রধান ও মন্ত্রী ছিলেন। ডা. জোবাইদা রহমান ও তারেক রহমানের বিয়ের মধ্য দিয়েই এই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সঙ্গে জিয়া পরিবারের আÍীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ডা. জোবাইদা রহমানের জন্ম ১৯৭২ সালে সিলেটে। তিনি উচ্চমাধ্যমিক শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্র“য়ারি তারেক রহমান ও ডা. জোবাইদা রহমান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন এবং পরে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার পর ২০২৫ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
সিলেট সফরের অংশ হিসাবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বুধবার রাতে শ্বশুরবাড়িতে যাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি জানান, ২০০৪ সালে দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নে একটি দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচি উদ্বোধনের পর প্রথমবারের মতো তারেক রহমান শ্বশুরবাড়িতে যান। দীর্ঘ ২১ বছর পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া।
সিলাম ইউনিয়নের বিরাহিমপুর গ্রামে জোবাইদা রহমানের স্বজনরা বাড়ির জামাইকে বরণ করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। রাতে আপ্যায়নের পাশাপাশি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতিচারণ করে বলেন, তারেক রহমান যখন প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে যান, তখন তার সঙ্গে ছিলেন গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী। দীর্ঘ ২১ বছর পর আবার তার আগমনে দক্ষিণ সুরমাবাসী উচ্ছ্বসিত। দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল ইবেন রাজা বলেন, তারেক রহমান শুধু দলের নেতা নন, তিনি সিলেটের মেয়ের জামাই, আমাদের দুলাভাই। তার আগমনে পুরো সিলাম ইউনিয়ন উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।
এদিকে শ্বশুরবাড়ির প্রবেশপথে তারেক রহমান ও ডা. জোবাইদা রহমানের ছবি সংবলিত তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। বাড়ির চারপাশের গাছ ও প্রধান গেট নতুন রঙে সাজানো হয়েছে। সব আয়োজনই ঐতিহ্যের বাড়ির জামাই তারেক রহমানকে ঘিরে।
ডা. জোবাইদা রহমান সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর ভাতিজি। এই ঐতিহ্যবাহী পরিবার ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বন্ধনে সিলেটবাসীর কাছে তারেক রহমান শুধু বিএনপির চেয়ারম্যান নন, তিনি ঐতিহ্যের বাড়ির জামাই।