মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতিতে স্বভাবতই বিভিন্ন উৎসব, আনন্দ ও উদ্যাপনের উপলক্ষ্য থাকে। ইসলাম মানুষের স্বভাবত আনন্দকে নিষিদ্ধ করে না; বরং তা সুশৃঙ্খল, শালীন এবং আল্লাহভীতির সীমার মধ্যে উদ্যাপনের কথা বলে। যেমন বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎসব নবান্ন। নতুন ধান ঘরে ওঠার সময় পিঠা, পায়েস ইত্যাদির আয়োজন করা গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। এতে বিশ্বাস বা কর্মগত এমন কোনো বিষয় নেই, যা ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুতরাং এ ধরনের আয়োজন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। রসুল (সা.)-এর সময়েও প্রাচীন আরব্য সংস্কৃতির কোনো অনুষঙ্গ ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে তিনি সেটাকে নিষেধ করতেন না। তবে কোনো উৎসব যখন এমন বিশ্বাস, প্রতীক ও আচারের বাহক হয়ে ওঠে, যা ইসলামি আকিদা ও তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তখন তা আর কোনো মুসলিমের জন্য স্বভাবত আনন্দের বিষয় থাকে না। বরং তা তার জন্য পরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়।
পয়লা বৈশাখ ও এর ক্রমবিকাশের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে আমরা এর তিনটি স্তর পাই। প্রাচীনকালে এটি ছিল মূলত জমিদারি আমলের খাজনা আদায়ের দিন। বছর শেষে প্রজাদের থেকে পাওনা মিটিয়ে জমিদাররা বৈশাখের প্রথম দিনে মিষ্টিমুখ করাতেন। পরে জমিদারিপ্রথা বিলুপ্ত হলে এটি হালখাতার উৎসবে রূপ নেয়। পাড়ামহল্লা ও গ্রামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বকেয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানাতেন এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে আপ্যায়ন করতেন। এটা ছিল নিছক সামাজিক একটি উৎসব। কিন্তু পয়লা বৈশাখ উদ্যাপের আধুনিক যে রূপ আমরা দেখছি, তার গোড়াপত্তন হয় ১৯৮৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উদ্যোগে (উইকিপিডিয়া)। প্রথমে এর নাম দেওয়া হয়েছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। কিছুদিন যেতে না যেতেই এর নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। আয়োজকদের ব্যাখ্যামতে মঙ্গল শোভাযাত্রার মানে হলো, মঙ্গলের উদ্দেশ্যে শোভাযাত্রা। যেটির সঙ্গে বিশ্বাসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি এর নাম পরিবর্তন হয়ে আবার আনন্দ শোভাযাত্রা হয়েছিল, এ বছর হয়তো বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে উদ্যাপিত হবে।
এদিন ঢোলতবলার তালে তালে দেবদেবীর বাহন ও বিভিন্ন জীবজন্তুর মুখোশ নিয়ে যে র্যালি বের করা হয়, তার মূল উদ্দেশ্য অমঙ্গল দূর করে মঙ্গলের আবাহন করা। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এসব মূর্তি ও মুখোশ স্রেফ আর্ট ও সৌন্দর্যের জন্য বহন করা হয়। বাস্তবতা হলো, আপনি মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক, চারুকলা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন শিক্ষকদের নানা সময়ে দেওয়া এ-সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোকে একত্র করলে নিশ্চিত হতে পারবেন যে এগুলো স্রেফ আর্টের জন্য করা হয় না। তাদের মতানুসারে এ শোভাযাত্রা বের করা হয় দেশের মানুষের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য। অথচ মঙ্গল ও অমঙ্গলের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা ২০১৮-এর ১৫ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন করেছিল, শিরোনাম ছিল ‘ঢাকার পয়লা যেন অষ্টমীর একডালিয়া’।
খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.) ও তাঁর মা মারইয়াম (আ.)-কে উপাসনা করে এবং তাঁদের কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহ সুরা মায়িদার ১৭ নম্বর আয়াতে এ বিশ্বাসের অসারতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ যদি মারইয়ামতনয় ঈসা, তাঁর মাতা এবং সমগ্র বিশ্বের সবাইকে ধ্বংস করতে চান, তবে তাঁকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কার আছে? উত্তর সুস্পষ্ট, কউ নেই। সুতরাং যাদের নিজেদের অস্তিত্বই আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তাদের উপাসনা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। যারা নিজেদেরই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়, তারা অন্যদের কীভাবে রক্ষা করবে? অতএব কল্যাণ ও মঙ্গলের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ। তা ছাড়া এ শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্রতিটি প্রতীকই কোনো না কোনো অমুসলিমি বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একজন মুসলিমের জন্য এমন বিশ্বাস রাখা সরাসরি শিরকের শামিল। পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের নামে এমন আরও অনেক কিছু প্রচলিত আছে যা মুসলিম ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মীয় কৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য ধারণ করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে। আমাদের সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।