October 27, 2026, 8:55 am

জাহাজ নির্মাণ শিল্প: হাতছাড়া হচ্ছে অপার সম্ভাবনা

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, October 27, 2026
  • 17 Time View

অর্থনীতি ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে বর্তমানে জাহাজ নির্মাণ খাতে এক বিশাল অর্থনৈতিক জোয়ার বইছে। নতুন বাণিজ্যিক রুট তৈরি, জাহাজের বহর আধুনিকায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়মের কারণে বিশ্ববাজারে নতুন জাহাজের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। অথচ দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকা, সুলভ শ্রমিক এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রয়েছে। অথচ দুই দশক আগেই বাংলাদেশ বিশ্বমানের জাহাজ তৈরি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতার জোরালো প্রমাণ দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের নানান সংকটের কারণে সম্ভাবনাময় এই খাতটি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক অর্থবছরে বাংলাদেশ এই খাত থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারেনি।

বিশ্ববাজারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন জাহাজ নির্মাণ কারখানায় বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণ জাহাজের অর্ডার জমা রয়েছে। যার সিংহভাগ অংশ দখল করে আছে চীন, এরপরের অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানি সাশ্রয়ী জাহাজের চাহিদা তৈরি হওয়ায় এই শিল্পে বিনিয়োগ আরও বেড়েছে। বিশ্বের পুরোনো বাণিজ্যিক জাহাজের বহর বদলে নতুন জাহাজ যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডগুলো এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়েছে। কারিগরি দক্ষতার অভাব না থাকলেও আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে দেশের উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক বাজারের এই জোয়ারের সুফল ঘরে তুলতে পারেননি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য নির্মাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার দারুণ একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ খাতের এই বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তীব্র ব্যাংকিং সংকট ও ঋণ অনিয়ম। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই শিল্পে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এই ধরনের ভারী শিল্প দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ এবং ক্রেতার কিস্তির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডগুলো চড়া সুদের বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। এর মধ্যে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং পরবর্তীতে কোভিড মহামারির ধাক্কা এই খাতকে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তোলে। অনেক বিদেশি ক্রেতা তাদের অর্ডার বাতিল করায় উদ্যোক্তারা তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েন। তবে শুধু বাহ্যিক মন্দা বা দুর্ভাগ্য নয়, বরং অতিরিক্ত উচ্চাশা, বেপরোয়া ঋণগ্রহণ এবং তা সঠিক খাতে ব্যবহার না করার প্রবণতা এই পতনের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান দশা এই খাতের ভঙ্গুর চিত্রকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। আনন্দ শিপইয়ার্ড ও ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের মতো সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক ঋণের পাহাড়সম বোঝা এবং অনিয়মের অভিযোগে জর্জরিত হয়ে পড়ে। ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বড় অংকের ঋণ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠায় দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থাকে তদন্ত করতে হয়। ব্যাংকগুলোর অপরিকল্পিত ঋণ বিতরণ এবং জবাবদিহিতার অভাব পুরো খাতটিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একের পর এক মামলা এবং খেলাপি ঋণের জাঁতাকলে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ সামান্য কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপযুক্ত আর্থিক শৃঙ্খলা না থাকলেও কারিগরি দক্ষতার জোরে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ তৈরি করে হস্তান্তর করছে। কাজেই কাঠামোগত সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে এই স্থবিরতা কাটিয়ে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © dainikkhobor.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com