August 25, 2026, 4:07 am

ময়নাতদন্তে চার জনকেই শ্বা/সরোধে হ/ত্যার আলামত

Reporter Name
  • Update Time : Tuesday, August 25, 2026
  • 32 Time View

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তাদের জবানবন্দির পরও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের দেওয়া ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্যের কিছু পার্থক্যও সামনে এসেছে। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। একই সঙ্গে মুখমণ্ডলে এসিড বা কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের প্রমাণ মেলেনি।

গত রোববার বিকেল ৫টার দিকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তারা। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুজন নিজেদের দায় স্বীকার করায় তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

তবে আদালতে তারা কী বলেছেন, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পুলিশ। ফলে তাদের স্বীকারোক্তির সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

চার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সোমবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের শরীরে শ্বাসরোধের আলামত পাওয়া গেছে। মরদেহ কয়েক দিন পড়ে থাকায় পচনের কারণে মুখমণ্ডলে বিকৃতি দেখা দিয়েছে। কিন্তু মুখে এসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চোয়াল ভেঙে দেওয়ার বিষয়টিও ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়নি। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামতের জন্য বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলো সিআইডির ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।

ফরেনসিক বিভাগের এই তথ্য তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, এর আগে মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়াকে কেন্দ্র করে এসিড বা রাসায়নিক ব্যবহারের নানা আলোচনা ছড়িয়ে ছিল। এখন ময়নাতদন্ত বলছে, এর কোনো প্রমাণ মেলেনি।

স্বীকারোক্তির পরও তদন্ত নিয়ে বিক্ষোভ
দুই আসামির গ্রেপ্তার ও আদালতে স্বীকারোক্তির খবরের মধ্যেই সোমবার রংপুরে বিক্ষোভ করেছেন জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, দ্রুত দুজনকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হয়ে যেতে পারে না। হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।

গতকাল দুপুরে জিলা স্কুলের সামনে মানববন্ধনের পর শোক মিছিল বের করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে নগরীর কাচারিবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তারা। কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও অংশ নেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশের দেওয়া হত্যার বর্ণনায় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। বিশেষ করে বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কাটার বিষয়, চারজনকে হত্যার সময় আশপাশের কেউ কোনো শব্দ না শোনা এবং হত্যার পর ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখার বিষয়গুলো বিস্তারিত তদন্তের দাবি রাখে।

জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়ে প্রশাসনকে তিন দিনের সময়সীমা দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তের অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাফিয়ার রহমান বলেন, গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের হত্যার ঘটনায় নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এই নাটক থেকে বেরিয়ে এসে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। আমরা সত্যকে জানতে চাই।

সাবেক শিক্ষার্থী চৌধুরী মাহমুদুন নবী ডলার বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই বাড়ির সিসিটিভির তার ও বৈদ্যুতিক তার কে কাটল। চারজনকে হত্যা করা হলো আশপাশের কেউ টের পেল না। এ রকম অনেক বিষয় আছে, সেগুলো ভালো করে তদন্ত না করেই, দুজনকে ধরে বলে দিল এরা খুনের সঙ্গে জড়িত– আমরা এসব বুঝি না।

এদিকে বিকেলে নগরীর রংপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তাঁর পরিবারের হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে মহানগর নাগরিক কমিটি। মানববন্ধন থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের দাবি জানানো হয়।

এ সময় বক্তব্য রাখেন মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকটে পলাশ কান্তি নাগ, সদস্য বিজয় প্রসাদ তপু, রংপুর মহানগর দোকান ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবির হোসেন আশরাফী, কবি মওদুদ আহমেদসহ অন্য নেতারা।

চার চিতায় শেষ বিদায়
রোববার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে চারজনের মরদেহ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রংপুর নগরীর দখিগঞ্জ মহাশ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে পাশাপাশি চারটি চিতায় তোলা হয় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশের মরদেহ। স্বজনের কান্নায় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

গণপতি চক্রবর্তীর দুই বড় ভাই গোপাল চক্রবর্তী ও গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, আমাদের ছোট ভাই গণপতি। সে খুবই সাদামাটা জীবন-যাপন করত। কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না। কিন্তু তাঁকে আজ এমন পরিণতির শিকার হতে হলো। আমরা হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © dainikkhobor.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com