ব্যবসায়িক লেনদেন বা অংশীদারি চুক্তির সুযোগ নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও বিশ্বাস ভঙ্গ করা হলে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি বিচার কার্যক্রম চলতে পারে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মো. শাহ আলম বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য মামলায় হাইকোর্ট এমন যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। গতকাল রোববার ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে চলতি বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. বজলুর রহমান এবং বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়ের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণাকালে হাইকোর্টে আবেদনকারী আসামির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবুল কাশেম। প্রতিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সালমা সুলতানা ও নজরুল ইসলাম ছোটন।
মামলার শুরু যেভাবে
রাজধানীর মিরপুর রোডে গাউছিয়া মার্কেটের একটি দোকানের মালিক শাহ আলম। দোকানটিতে অংশীদারি লভ্যাংশ দেওয়ার শর্তে কাপড় ব্যবসায়ী মো. জাহিদ খান ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেন। অর্থাৎ অংশীদারি চুক্তির মাধ্যমে এ ব্যবসা পরিচালনা করেন জাহিদ। এরপর ২০১২ সালে শাহ আলম ওই দোকানটি এক কোটি সাত লাখ টাকা দাম নির্ধারণ করে জাহিদের কাছে বিক্রি করেন।
পরে জাহিদ খান ও শাহ আলমের মধ্যে লেনদেন শুরু হয়। এক কোটি সাত লাখ টাকা মূল্যের দোকানটি ক্রয়ের সমঝোতায় জাহিদ বিভিন্ন সময়ে সব মিলিয়ে ৮৬ লাখ টাকা প্রদান করেন। পরে শাহ আলম দোকান রেজিস্ট্রি করে দিতে টালবাহানা শুরু করলে বিষয়টি দোকান মালিক সমিতি সালিশি করে জাহিদ খানের পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। তবে শাহ আলম সম্পূর্ণ টাকা প্রাপ্তির বিষয় ও চুক্তির অস্তিত্বই অস্বীকার করেন এবং নালিশকারীকে প্রাণনাশের হুমকি দেন ও চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাহিদ ঢাকার সিএমএম আদালতে শাহ আলমের বিরুদ্ধে সি আর মামলা করেন।
প্রাথমিক তদন্ত ও শুনানির পর একই বছরে শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। এরপর শাহ আলম ফৌজিদারি কার্যবিধির ৫৬১-এ ধারার অধীনে অভিযোগ গঠনের আদেশ স্থগিত ও মামলা বাতিল চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির উদ্ধৃত করে দাবি করেন, ব্যবসায়িক হিসাব বা অংশীদারি চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনে বিশ্বাস ভঙ্গ বা প্রতারণার অভিযোগের বিচার চলে না। এটি মূলত অংশীদারি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়, যা দেওয়ানি বিরোধের এখতিয়ারভুক্ত। হাইকোর্ট এ মামলার শুনানি নিয়ে অধস্তন আদালতের আদেশ স্থগিত করার পাশাপাশি রুলও জারি করেন।
এরপর চলতি বছরে এ মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হলে অধস্তন আদালতের বাদী জাহিদ খানের আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ যুক্তি উপস্থাপনকালে বলেন, কোনো অংশীদারি চুক্তির শুরুতেই অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অর্থ গ্রহণ ও পরে তা আত্মসাৎ করা ফৌজদারি অপরাধের শামিল। এ-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের একাধিক নজির তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার খোলা থাকলেও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিচার চলতে কোনো আইনি বাধা নেই।
হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ এ ধারায় মামলা বাতিলের আবেদন বিবেচনার সময় আদালত মূলত নালিশি দরখাস্তের অভিযোগগুলো বিবেচনা করেন। যেহেতু আবেদনে অংশীদারি চুক্তির শুরুতেই প্রতারণা, অসাধু উদ্দেশ্য ও অর্থ আত্মসাতের নির্দিষ্ট উপাদান বিদ্যমান, তাই এটি কেবল দেওয়ানি বিরোধ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আসামি (শাহ আলম) প্রকৃতপক্ষে দোকানের মালিক ছিলেন কিনা কিংবা তিনি অর্থ পেয়েছিলেন কিনা– এসব তর্কিত বিষয় বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে হবে; এই পর্যায়ে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করতে পারে না। অধস্তন আদালতের আসামির (শাহ আলম) বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী অভিযোগ (চার্জ) গঠিত হয়েছে। যা বিচারের মুখোমুখি করার জন্য পর্যাপ্ত। এতে আদালতের প্রক্রিয়ার কোনো অপব্যবহার হয়নি।
হাইকোর্ট রায় বলেন, বর্তমান মামলায় আমরা দেখতে পাই যে, নালিশি দরখাস্তে আসামির (শাহ আলম, যিনি হাইকোর্টে বাদী) শুরু থেকেই প্রতারণামূলক অভিপ্রায় এবং পরে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে। সুতরাং দেওয়ানি বিরোধের অজুহাতে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা যাবে না।