শিশুদের হাতে স্মার্টফোন খুব স্বাভাবিক একটি দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলে যাওয়া বা না যাওয়া বয়সেই অনেক শিশুর নিজস্ব ফোন আছে।
অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য উদ্বেগজনক।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে- বেশিরভাগ শিশুই বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ করা বয়সের অনেক আগেই স্মার্টফোন পাচ্ছে।
অল্প বয়সে ফোন ব্যবহারের বাস্তব চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’য়ের এক জরিপে- ১১ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুদের অভিভাবকদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন- তাদের সন্তানের নিজস্ব স্মার্টফোন রয়েছে। এই জরিপ করা হয় ১২ বছর বা তার কম বয়সি তিন হাজারের বেশি শিশুর অভিভাবকদের মধ্যে।
পর্যবেক্ষণমূলক এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে- শিশুরা শুধু ফোনই নয়, অল্প বয়সেই বৈদ্যুতিক পর্দায় সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলছে। এমনকি দুই বছরের কম বয়সি শিশুরাও নিয়মিত ভিডিও দেখছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক কলিন ম্যাকলেইন সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “এত অল্প বয়সে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার চোখে পড়ার মতো বিষয়। শিশুর জীবনে পর্দার উপস্থিতি যেভাবে খুব ছোট বয়স থেকেই শুরু হচ্ছে, তা অভিভাবকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।”
যে কারণে এত অল্প বয়সে শিশুর হাতে ফোন দিচ্ছেন অভিভাবকরা
এই গবেষণায় দেখা গেছে, অভিভাবকরা মূলত সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন থেকেই ফোন দিচ্ছেন। অনেক বাবা–মা মনে করেন, শিশু যদি কোথাও অস্বস্তিতে পড়ে, অসুস্থ হয় বা বিপদে পড়ে, তাহলে ফোন থাকলে সহজেই যোগাযোগ করা যাবে।
এই যুক্তি একেবারে অমূলক নয়। তবে প্রশ্ন হল, এই যোগাযোগের জন্য স্মার্টফোনই কি একমাত্র উপায়?
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি’তে অবস্থিত ‘ফেয়ারলি ডিকিনসন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবিদ্যার অধ্যাপক কারা আলাইমো সিএনএন ডটকম’য়ের একই প্রতিবেদনে বলেন, “যোগাযোগের প্রয়োজনে স্মার্টফোন দেওয়া মানেই শিশুকে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।”
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমেই শিশু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হয় এবং সেখানেই অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্কদের মাধ্যমে শোষণের আশঙ্কা তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ঝুঁকি যে কারণে বেশি
কারা আলাইমো তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘বয়ঃসন্ধিকালীন অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ব্যবহার শিশুদের আত্মমর্যাদা, মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধির সময় সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ব্যবহার শুরু করলে এক বছর পর সেই শিশুদের জীবনে সন্তুষ্টির মাত্রা কমে যায়।
এই বয়সের শিশুরা সমালোচনা, তুলনা কিংবা অনলাইন চাপ সামলানোর মতো মানসিক প্রস্তুত থাকে না।
স্মার্টফোন ছাড়া যোগাযোগের বিকল্প পথ
সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন সব মা-বাবাকেই চিন্তায় ফেলে। তবে স্মার্টফোন ছাড়াও এর বিকল্প আছে।
কারা আলাইমো অভিভাবকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “এমন ফোন ব্যবহার করা যেতে পারে, যা শুধু কথা বলা ও বার্তা পাঠানোর কাজে সীমাবদ্ধ। এতে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ব্যবহার করা যায় না।”
এছাড়া এমন ঘড়িও রয়েছে, যার মাধ্যমে শিশু ফোন করতে পারে, বার্তা পাঠাতে পারে এবং অভিভাবক চাইলে শিশুর অবস্থান জানতে পারেন।
অনেক পরিবারে আবার একটি পারিবারিক ফোন রাখা হয়, যা শিশু প্রয়োজনে বাইরে নিয়ে যেতে পারে। তবে সেটি তার ব্যক্তিগত ‘ডিভাইস’ নয়।
বন্ধুবান্ধবের চাপ
অল্প বয়সে ফোন ব্যবহারের আরেকটি বড় কারণ হল- সহপাঠীদের চাপ।
অনেক অভিভাবক মন্তব্য করেন- তাদের সন্তানের বন্ধুরা ফোন ব্যবহার করে, তাই সন্তানও ফোন চায়। তারা ভয় পান, ফোন না দিলে সন্তান সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে মনোচিকিৎসক লরেন টেটেনবাউম পরামর্শ দেন, “অভিভাবকদের উচিত সন্তানের বন্ধুদের অভিভাবকদের সঙ্গে আগেভাগেই কথা বলা। সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিলে শিশুদের ওপর চাপ কম পড়ে।”
যদি ফোন আগেই দেওয়া হয়ে থাকে
অনেক পরিবারেই শিশুর হাতে ইতিমধ্যে স্মার্টফোন চলে গেছে। এমন ক্ষেত্রে হতাশ না হয়ে নিয়ম-কানুন নতুন করে ভাবতে বলেন বিশেষজ্ঞরা।
ফোন ব্যবহারের সময়, উদ্দেশ্য এবং সীমা স্পষ্ট করে দিতে হবে।
কারা আলাইমোর মতে, “ঘুমের সময়, পড়াশোনার সময়, খেলাধুলা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়গুলো নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে। ফোনের কারণে যদি এসব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে নিয়ম কার্যকর হচ্ছে না বলে, ধরে নিতে হবে। আর নিয়ম করলে তা মানা নিশ্চিত করাও জরুরি।”
নিয়ম তৈরিতে শিশুকে যুক্ত করা যে জন্য জরুরি
ফোন ব্যবহারের নিয়ম শিশুর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করলে তারা তা মানতে বেশি আগ্রহী হয়। শিশুরা কীভাবে ফোন ব্যবহার করতে চায়, তারা কী ন্যায্য মনে করে— এসব প্রশ্ন করলে নিয়ম তাদের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হবে।
একই সঙ্গে শিশুকে স্পষ্ট করে জানাতে হবে, ‘ডিভাইস’টি অভিভাবকের সম্পত্তি। প্রয়োজনে অভিভাবক যে কোনো সময় তা পরীক্ষা করতে পারেন। এতে শিশুরা দায়িত্বশীল আচরণ করতে শেখে।
অভিভাবকদের জন্যও নিয়ম দরকার
শুধু শিশু নয়, অভিভাবকদের নিজেদেরও ফোন ব্যবহারে উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
খাবারের টেবিলে ফোন ব্যবহার না করা, সন্তানের সামনে অকারণে পর্দায় সময় না কাটানো— এসব আচরণ শিশুদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অভিভাবক যদি ফোন ব্যবহার করেন, তাহলে কেন করছেন তা সন্তানের সামনে ব্যাখ্যা করা উচিত। এতে শিশু বুঝতে শেখে, ফোন সব সময় বিনোদনের জন্য নয়।
বিকল্প আনন্দের পথ দেখানো
যদি মনে হয়, শিশুর ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাহলে বিকল্প আনন্দের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একদিন বেশি পর্দায় সময় গেলে পরদিন বাইরে খেলাধুলা, বই পড়া বা পারিবারিক সময় কাটানোর পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
এই পরিকল্পনায় শিশুকেও যুক্ত করলে তারা আগ্রহ পায়।