এবারের আসন্ন ঈদুল আজহায় দেশের চামড়া খাতে একটি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা। বিগত কয়েক বছর ধরে কোরবানির চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এবং লবণজাতকরণ ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায়, দেশের শীর্ষ কওমি মাদ্রাসাগুলো এবং বিভিন্ন অঞ্চলের (যেমন সিলেট বিভাগ) মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবার কোরবানির চামড়া সংগ্রহ না করার (বর্জন) ঘোষণা দিয়েছে।
কোরবানির সময় হাজার হাজার চামড়া নষ্ট হওয়া এবং এর ন্যায্যমূল্য না পাওয়া বাংলাদেশের একটি অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়। এই সংকটের পেছনে কোনো অদৃশ্য “বিদেশি চক্র” বা কাল্পনিক ষড়যন্ত্রের চেয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা, বাজার সিন্ডিকেট এবং কারিগরি দক্ষতার অভাবই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। অর্থনীতিবিদ, ট্যানারি মালিক, আড়তদার এবং মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের জন্য কারণগুলো হচ্ছে
১. ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের “অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট” ২. সঠিক সময়ে লবণ না দেওয়া এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অদক্ষতা ৩. পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর অদক্ষতা ৪. সাভার চামড়া শিল্পনগরীর (সিইটিপি) ব্যর্থতা ৫. পাচারকারী চক্র ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।
যেহেতু দেশে উৎপাদিত মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০-৬০% কোরবানির ঈদে সংগৃহীত হয় এবং এর বড় অংশই মাদ্রাসার মাধ্যমে আসত, তাই এবার সাধারণ কোরবানিদাতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চামড়া নষ্ট হওয়া বা পাচার হওয়া রোধে আমাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত স্তরে কি প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ পদ্ধতি পশু জবাইয়ের পর থেকে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত সময়টা খুব সংবেদনশীল। সঠিক সময়ে সংরক্ষণ না করলে ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণে চামড়া পচে যায়।
কওমি মাদ্রাসাগুলোর চামড়া বর্জনের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে মে ২০২৬-এর মাঝামাঝিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত কোরবানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে।
সরকার বিষয়টিকে একটি ‘জাতীয় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে নিয়েছে। সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যদি দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করা যায় তবে আশা করা যায় রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সফলতা আসবে। সরকারি উদ্যোগগুলো নিচ্ছেন তুলে ধরা হলো
বিনা মূল্যে লবণ বিতরণ: মাদ্রাসা ও এতিমখানা গুলোর অনুকূলে সরকার ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যার একটি বড় অংশ দিয়ে লবণ কিনে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে।
বরাদ্দ: প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ৯,৮০০ টনেরও বেশি লবণ কেনা হয়েছে।
বিতরণ মাধ্যম: বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর মাধ্যমে এই লবণ সরাসরি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করা হবে (সবচেয়ে বেশি ১,০০৫ টন লবণ বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম)।
২. নতুন মূল্য নির্ধারণ (বর্গফুট প্রতি ২ টাকা বৃদ্ধি)
চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা দাম বাড়িয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত এই বছরের লবণযুক্ত চামড়ার নির্ধারিত মূল্য তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
পশুর ধরন এলাকা নির্ধারিত মূল্য (প্রতি বর্গফুট)
গরুর কাঁচা চামড়া ঢাকার ভেতরে ৬২ – ৬৭ টাকা
গরুর কাঁচা চামড়া ঢাকার বাইরে ৫৭ – 6২ টাকা
খাসির চামড়া সারা দেশে ২৫ – ৩০ টাকা
বকরির চামড়া সারা দেশে ২২ – ২৫ টাকা
প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা: সঠিক নিয়মে পশু জবাই এবং চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জন সচেতনতার জন্য প্রায় ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
বাজার মনিটরিং: চামড়ার সরকার নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করতে এবং সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার রোধে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি: টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা পাঠানো হবে। ঈদের ৩ দিন আগে থেকে টিভিতে তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টারি) প্রচার করা হবে।
স্থানীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কি প্রস্তুতি থাকতে হবে?
মাদ্রাসাগুলো চামড়া না নিলে চামড়া দ্রুত পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কোরবানিদাতাদের নিজেদেরই প্রাথমিক সংরক্ষণের প্রস্তুতি নিতে হবে:
ক. পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর সময় সতর্কতা
সঠিক ছুরি ব্যবহার: চামড়া কাটতে সুচালো এবং ছাড়াতে বাঁকানো ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে, যাতে ‘লেস-কাট’ না পড়ে।
খ. পরিষ্কার রাখা: রক্তমাখা ছুরি চামড়ায় মোছা যাবে না; চামড়া থেকে চর্বি, মাংস, রক্ত ও ময়লা দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে।
গ. সঠিক নিয়মে লবণ প্রয়োগ (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) চামড়া ছাড়ানোর ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই লবণ লাগাতে হবে। লবণ দিতে দেরি হলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে চামড়া পচে যায়।
ঘ. সংরক্ষণ স্থান নির্বাচন: লবণযুক্ত চামড়া রোদ-বৃষ্টি থেকে দূরে, বাতাস চলাচলযুক্ত ও সামান্য ঢালু স্থানে রাখতে হবে, যাতে পানি সহজে বের হয়ে যায়। এভাবে চামড়া ৭–১০ দিন নিরাপদে সংরক্ষণ করা যায়।
ঙ. আপনার এলাকার মাদ্রাসা বা লিল্লা বোর্ডিং চামড়া সংগ্রহ করবে কিনা তা ঈদের আগেই জেনে নিন। যদি তারা সংগ্রহ না করে, তবে পশু কেনার সময়ই চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ (৮-১০ কেজি) লবণও সাথে কিনে রাখুন। অবহেলায় দেশের এই মূল্যবান জাতীয় সম্পদ যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে আমাদের সবার খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
চ. পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক তরুণ ও সামাজিক সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে অস্থায়ীভাবে চামড়া সংগ্রহ ও লবণজাতকরণের উদ্যোগ নিতে পারে, যা চামড়া নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
ঙ) ক্ষতি রোধ: আনাড়ি বা অসচেতন কসাইয়ের কারণে প্রতিবছর প্রচুর চামড়া কাটা পড়ে নষ্ট হয়। দক্ষ লোক দিয়ে এবং বাঁকানো মাথার ছুরি ব্যবহার করে চামড়া ছাড়ানো নিশ্চিত করা, যেন চামড়ার গুণগত মান ঠিক থাকে।
যাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে পারেন না, তাঁরা চামড়া ছাড়ানোর ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ আড়ত বা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে কাঁচা চামড়া বিক্রি করে দেন। ঢাকার পোস্তা বা বিভিন্ন আঞ্চলিক হাটে এই চামড়া দ্রুত স্থানান্তরিত হয়।
কোরবানির চামড়া সংকট কোনো অলৌকিক সমস্যা নয়; এটি স্রেফ সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনার অভাব। সরকার যদি লবণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত ঘোষণা করেছে, তার সাথে সাভারের পরিবেশগত ছাড়পত্রের কাজ শেষ করে এবং বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়—তবে এই চামড়া শিল্প আবারও দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে।
দেশের এই মূল্যবান জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং অর্থনীতিতে এর অবদান নিশ্চিত করতে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের করণীয় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। চামড়া রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়। আমাদের সামান্য সচেতনতা ও সঠিক সময়ে লবণের সঠিক ব্যবহার এই জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
নিউইয়র্ক