July 1, 2026, 4:05 am
সর্বশেষ সংবাদ:
ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে নদীপারের মানুষের ছাত্রদলের ১৭ বছরের আন্দোলনের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুলাই অভ্যুত্থানে: রিজভী বাজেট পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল করলেন প্রধানমন্ত্রী, সাশ্রয় ৫০ লাখ টাকা স্বাধীনতার বিরোধিতার দায়ে বিএনপির ক্ষমা চাওয়া উচিত: গোলাম পরওয়ার বিসিবির বর্তমান কমিটিতে ক্রিকেট গতিশীল হবে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের প্রশিক্ষণার্থীদের সনদপত্র বিতরণ ও বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত আগামী ৫ দিন আবহাওয়া কেমন থাকবে, জানাল অধিদপ্তর বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হবে ব্যাংকিং খাত: জামায়াত এমপি জাতীয় সংসদে আইনজীবীর পোশাকে রুমিন ফারহানা, সংসদে আলোচনা মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানকে আলাদা করার সুযোগ নেই: আখতার হোসেন

বেকারত্বের ‘লোডশেডিং’: দায়ী কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা?

Reporter Name
  • Update Time : Friday, May 15, 2026
  • 52 Time View
62

একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি কেবল সনদসর্বস্ব হয় কিংবা কর্মবিমুখ পরনির্ভরশীল জাতি তৈরি করে, তবে তা আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়েই বেশি দেখা দেয়। বর্তমানে আমাদের দেশে আধুনিক ও ধর্মীয়—উভয় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই এক গভীর সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে আধুনিক শিক্ষা নৈতিকতাহীন ‘ডিজিটাল চোর’ তৈরি করছে, অন্যদিকে ধর্মীয় শিক্ষার ভুল প্রয়োগে তৈরি হচ্ছে এক বিশাল পরনির্ভরশীল জনগোষ্ঠী। এই বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথ হলো সুপরিকল্পিত কারিগরি শিক্ষা।
আধুনিক শিক্ষার নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় শিক্ষার সীমাবদ্ধতা জন্য আমাদের প্রচলিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা মেধাবী ছাত্র তৈরি করলেও অনেক ক্ষেত্রে মানবিক ও নৈতিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে দুর্নীতি ও ঘুষের মহোৎসব। শিক্ষিত যুবকদের একটি বড় অংশ মেধা ব্যবহার করছে জালিয়াতি আর ডিজিটাল চুরির পেছনে। মন্ত্রীপাড়া থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত ঘুষটা উপহারে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হলেও বর্তমানে তা নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। যে ইসলাম আমাদের বিশ্বজয়ের প্রেরণা দেয়, সেই ইসলামের নামেই আজ আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিত মাদ্রাসা ও এতিমখানা। এর ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ কর্মহীন হয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। পর্যাপ্ত কারিগরি দক্ষতা না থাকায় এদের একটি বড় অংশ পর-নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা প্রকারান্তরে বেকারত্বের হারকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বনাম বর্তমান বাস্তবতা:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রম এবং সক্রিয়তার অনন্য উদাহরণ। তিনি শৈশবে দুম্বা (মেহেশ) চড়িয়েছেন, যৌবনে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে বিবি খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক কাফেলা পরিচালনার মাধ্যমে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তিনি কেবল একজন ধর্মপ্রচারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে রাষ্ট্রনায়ক, দক্ষ সেনাপতি এবং নিপুণ বিচারক। হাত পেতে নেয়া নয়, বরং হাত খুলে দেওয়ার শিক্ষাই তিনি দিয়ে গেছেন।
ইসলাম কখনো ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করেনি। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা পাই আত্মনির্ভরশীলতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জনৈক ব্যক্তিকে ভিক্ষা না দিয়ে তিনি কুঠার কিনে দিয়েছিলেন এবং পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে তোমরা আমার আয়াতকে সস্তা মূল্যে বিক্রি করোনা। অথচ আজ দেখা যাচ্ছে এক শ্রেণির আলেম সমাজ মসজিদ-মাদ্রাসা বা এতিমখানার দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে অর্থ সংগ্রহে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে পড়েছেন। ইসলামের সুমহান শিক্ষাকে ব্যবহার করে বিলাসবহুল জীবন যাপন করা এবং ছাত্র সমাজকে চাঁদাবাজির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।অথচ ইসলামের পরিপূর্ণ সফলতার কাজ হচ্ছে ইকামতে দ্বীনের কাজ করা। আর আমাদের বর্তমান আলেম সমাজ ইকামতের দিনের পরিবর্তে ইকামতে দুনিয়ার কাজ আঞ্জাম দেখছেন।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, হাজার হাজার ছাত্রকে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় করা হচ্ছে যা তাদের জাগতিক কোনো কর্মদক্ষতা দিচ্ছে না। এই ছাত্ররা যখন শিক্ষা জীবন শেষ করে বের হচ্ছে, তখন তারা সমাজের মূলধারার কর্মসংস্থানের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে তারা আবার সেই দোয়া-দরুদ, খতম আর দান-খয়রাতের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। এটি কি রাসূলের সেই শিক্ষা, যেখানে তিনি (সা:) বলেছেন— “উপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম”?
ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণে আমরা কি কখনো তাদের প্রশ্ন করেছি— এটিই কি রাসূলের পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা? রাসূল (সা.) তো ভিক্ষুককে কুঠার কিনে দিয়ে কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছিলেন। তবে কেন আজ আমাদের আলেমরা লাখ লাখ তরুণকে কুঠারের বদলে কেবল ‘চাঁদার থালা’ ধরিয়ে দিচ্ছেন?

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোলনের উপায় কি? এই প্রশ্নের সমাধান শুধু সামাজিকভাবে নয় রাষ্ট্রীয়ভাবে চিন্তা করার সময় এসেছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোরআন হাদিসের শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা কিংবা আধুনিক শিক্ষায় মান উন্নয়নের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থাকে চরিত্র গঠনের মূল্যবোধ জাগরণের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
যেমন ধরুন,
দেশের আধুনিক বা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই অন্তত একটি কারিগরি বিষয় বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
প্রথমত প্রতিটি স্কুলে আধুনিক ল্যাব এবং ওয়ার্কশপ স্থাপন করা যাতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিল্পকারখানার সংযোগ স্থাপন করা, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
সাধারণ শিক্ষার যারা খুব ভালো মানের সফলতা আসার সম্ভাবনা কম তাদের পেছনে বছরের পর বছর ব্যয় না করে তাদেরকে যদি ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল, কৃষিপ্রযুক্তি বা আইটি খাতে দক্ষ করা যায়, সেই পরিকল্পনা গ্রহণ কাজ করা। যাতে তারা দেশের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হয়।

অনুরূপভাবে কওমি মাদ্রাসার বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
প্রথমত:
ধর্মীয় শিক্ষার মৌলিক কাঠামো ঠিক রেখে এর সাথে আইটি (IT), গ্রাফিক ডিজাইন, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্ক বা দর্জি বিজ্ঞানের মতো ট্রেড কোর্সগুলো যুক্ত করা।
দ্বিতীয়ত
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা এবং তাদের অর্জিত দক্ষতার রাষ্ট্রীয় সনদ প্রদান করা। এতে করে তারা দেশে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ পাবে।
এ ব্যাপারে প্রবাসীদের একটি ভূমিকা রাখা যায় যেমন
মাদ্রাসা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রবাসীদের দান যেন কেবল দালানকোঠায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সেই অর্থ দিয়ে যদি কারিগরি ও আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তবে বেকারত্ব দূর হবে এবং আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।

হাত পাতার মানসিকতা কোনো জাতিকে মহান করতে পারে না। আমাদের বুঝতে হবে, প্রকৃত ইবাদত কেবল তসবিহ পাঠে নয়, বরং হালাল উপায়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের মধ্যেও নিহিত। আমরা যদি এখনো কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই এবং অপরিকল্পিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে লালন করি, তবে বেকারত্বের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। তাই সময় এসেছে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি দক্ষ, কর্মঠ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার।
ধর্মকে পুঁজি করে জীবন ধারণ করা নবীর আদর্শ নয়। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন পরিশ্রমী মুমিন আল্লাহর প্রিয় বন্ধু। তাই আমাদের দাবি হওয়া উচিত— এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা আমাদের আলেমদের কেবল মসজিদের মেহরাবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের আসনেও সমাসীন করবে। দান-খয়রাতের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিজ হাতের শ্রমে গড়ে উঠুক আমাদের আগামীর ছাত্র সমাজ।

মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
নিউইয়র্ক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © dainikkhobor.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com