নব্বই মিনিটের লড়াই শেষে কেউ বেঁচে থাকে উল্লাসে, কেউ ডুবে যায় অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাসে। বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টায় এমনই এক আবেগঘন কোয়ার্টার-ফাইনালে মুখোমুখি হবে নরওয়ে ও ইংল্যান্ড।
বিশ্বকাপের শেষ চারে ওঠার লড়াইয়ে একদিকে আর্লিং হলান্ডের স্বপ্নবাজ নরওয়ে, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। এক দল ইতিহাস ফিরিয়ে আনতে চায়, অন্য দল ইতিহাস গড়তে চায়।
মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস অবশ্য ইংল্যান্ডের পক্ষেই কথা বলে। দুই দল সাতবার মুখোমুখি হয়েছে। ইংল্যান্ড জিতেছে পাঁচটি ম্যাচ, নরওয়ের জয় মাত্র একটি, একটি ম্যাচ ড্র। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অতীতের পরিসংখ্যান খুব কমই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। একটি গোল, ভুল কিংবা একজন ফুটবলারের জাদুকরী মুহূর্তই বদলে দিতে পারে সব হিসাব।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে খুব কম মানুষই নরওয়েকে শেষ আটে কল্পনা করেছিলেন। আজ তারা কোয়ার্টার-ফাইনালে।
ব্রাজিলকে হারিয়ে তারা পৌঁছেছে এই মঞ্চে। সেই জয়কে নরওয়ের কোচ স্টলে সোলবাকেন দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্বকাপে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুধু অংশ নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও এসেছে তার দল।
রূপকথার কেন্দ্রবিন্দু আর্লিং হালান্ড। চলতি বিশ্বকাপে গোল তার নিত্যসঙ্গী। ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নরওয়েকে শেষ আটে তুলেছেন। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও অন্যতম শীর্ষে। ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে আত্মবিশ্বাসী হলেও চাপটা প্রতিপক্ষের কাঁধেই তুলে দিয়েছেন।
হালান্ডের ভাষায়, ‘চাপ সব ইংল্যান্ডের ওপর। সবাই তাদের ফেভারিট বলছে। আমরা শুধু আমাদের ফুটবল খেলতে চাই।’ হালান্ডের বিশ্বাস, ভয়হীন ফুটবলই নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
হালান্ড একটি জাতির আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তার ভাইকিং উদযাপন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দৃশ্য। নরওয়ের শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম সবখানেই এখন হলান্ড উন্মাদনা।
তবে নরওয়ের শক্তি শুধু হালান্ড নন। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা, প্যাট্রিক বার্গের বুদ্ধিদীপ্ত মাঝমাঠ, আন্দ্রেয়াস স্কেলদেরুপের গতি, দলটি এখন অনেক বেশি পরিণত। সাবেক ডিফেন্ডার ওডিন বিওরটুফটও মনে করেন, নরওয়ের আসল শক্তি তাদের ঐক্য এবং দলগত ফুটবল।
ইংল্যান্ডের গল্পটা অপেক্ষার। ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়া হয়নি। প্রতিটি বিশ্বকাপ নতুন আশা নিয়ে শুরু হলেও শেষ হয়েছে হতাশায়। এবার সেই চক্র ভাঙতে চান থমাস টুখেল। জার্মান এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর ইংল্যান্ডের খেলায় এসেছে নতুন প্রাণ। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ১০ জন নিয়ে যে লড়াই করে জয় তুলে নিয়েছে ইংল্যান্ড, সেটিকে টুখেল ‘নায়কোচিত পারফরম্যান্স’ বলে বর্ণনা করেছেন।
‘এই দলের হৃদয় আছে, বিশ্বাস আছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা লড়তে জানে। এমন অভিজ্ঞতা একজন কোচ হিসেবে কখনও ভুলব না’ বলেছেন টুখেল।
টুখেল মনে করেন, চাপ সব সময় নেতিবাচক নয়। বড় দল হওয়ার অর্থই হলো চাপ নিয়ে খেলতে শেখা। এই চাপই ইংল্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন কাছেও বিশ্বকাপ শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়,’বিশ্বকাপের জন্যই আমরা বেঁচে থাকি। এই ট্রফিটাই প্রতিটি ফুটবলারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন,’ ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কেইন।
চলতি বিশ্বকাপেও কেইন দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, ডেকলান রাইসের নিয়ন্ত্রণ, বুকায়ো সাকার গতি, ফিল ফোডেনের কারুকাজ মিলিয়ে ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ এখন বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর।
ম্যাচের আরেকটি আবেগঘন গল্প জড়িয়ে আছে হলান্ড ও জুড বেলিংহামকে ঘিরে।
একসময় বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে একসঙ্গে খেলেছেন দুই বন্ধু। মাঠের বাইরে তাদের বন্ধুত্ব নিয়ে অসংখ্য গল্প আছে। এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একে অপরের প্রতিপক্ষ। বন্ধুত্ব ৯০ মিনিটের জন্য থেমে থাকবে, এরপর আবার ফিরে আসবে। কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি হবে দুর্দান্ত।
ইংল্যান্ড চাইবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। ডেকলান রাইস ও বেলিংহাম ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে নরওয়ের ওপর চাপ বাড়বে। নরওয়ের লক্ষ্য থাকবে দ্রুত বল জিতে ওডেগার্ডের পাসে হলান্ডকে খুঁজে বের করা। সবচেয়ে বড় লড়াই হবে ইংল্যান্ডের রক্ষণ বনাম হালান্ড।
এক মুহূর্তের অসাবধানতা মানেই গোল। আবার জন স্টোনসরা যদি হালান্ডকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারেন, তাহলে নরওয়ের আক্রমণ অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। ইংল্যান্ড শিবিরও জানে, এই ম্যাচ সহজ হবে না।
দলের তরুণ মিডফিল্ডার নিকো ও’রাইলি বলেছেন, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালের অভিজ্ঞতা ইংল্যান্ডের বড় শক্তি। আগের দুই বিশ্বকাপের শিক্ষা এবার কাজে লাগাতে চায় দল। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নায়ক আর খলনায়কের ব্যবধান অনেক সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
একটি কর্নার, একটি হেড, একটি দুর্দান্ত সেভ কিংবা একটি ভুল পাস বদলে দিতে পারে কোটি মানুষের ভাগ্যের গল্প। হয়তো আজ রাতেই হলান্ড নরওয়েকে প্রথমবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলবেন। হয়তো হ্যারি কেন আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবেন তার আজীবনের স্বপ্নের দিকে।
হয়তো জুড বেলিংহাম আবারও প্রমাণ করবেন, কেন তাকে ইংল্যান্ডের ভবিষ্যৎ বলা হয়। আবার হয়তো টুখেলের ইংল্যান্ড লিখবে নতুন ইতিহাস। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের আকাশ ভরে যাবে আনন্দের পতাকায়। অন্য দেশের স্টেডিয়াম ছেড়ে বের হবে নীরব মানুষ।